যেখানে ভূতের ভয়

আঁকা : সোহানুর রহমান
পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম এক শহর হিসেবে রাজশাহীর সুনাম আছে। আর এ শহরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে নানা অতিপ্রাকৃত গল্প। কোনো কোনো জায়গায় এখনো ঘটে রহস্যময় কাণ্ড। এমনই এক সড়ক আর দালানের ভয়ের জগতে আপনাদের নিয়ে যাচ্ছেন লুৎফুল কায়সার
রাজশাহী শহরের বয়স্ক লোকদের মধ্যে এ কাহিনিটি খুবই জনপ্রিয়। রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে মাঝেমধ্যেই নাকি রহস্যময় একজন মানুষ দেখা যেত। যখন রাস্তাটির দুই পাশে এত আলো ছিল না আর গভীর রাতে চারপাশ ডুবে যেত এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায়, তখন হাজির হতো ওই আগন্তুক।
শোনা যায়... বহু বছর আগে, এক বর্ষার রাতে, এক যুবক মোটরসাইকেল চালিয়ে নাটোর থেকে রাজশাহী ফিরছিল। আকাশ ঢেকে ছিল কালো মেঘে, ঝিরঝিরে বৃষ্টিও পড়ছিল। রাস্তা বলতে গেলে ফাঁকাই ছিল। তাই যুবকটি বেশ জোরেই মোটরসাইকেল চালাতে শুরু করে এবং অসাবধানতাবশত শহরে ঢোকার খানিকটা আগেই একটি ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলটির সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনাটি এতই ভয়াবহ ছিল যে, ঘটনাস্থলেই যুবকটি মারা যায়। কারও কারও মতে, তার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
এরপর কয়েক মাস সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ অবশ্য মহাসড়কে সাদা শার্ট পরা একজন রহস্যময় লোককে ঘুরে বেড়াতে দেখে, কিন্তু তারা সেভাবে ব্যাপারটা গুরুত্ব দেয়নি।
কুয়াশায় লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে রিকশাচালক খেয়াল করেন তার পা মাটি স্পর্শ করছে না
এরপরই একজন রিকশাচালকের সঙ্গে ঘটে যায় অদ্ভুত এক ঘটনা। লোকটির দাবি, সে মহাসড়কের নির্জন অংশে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক লোককে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। রিকশা কাছে আসতেই সে ধীরে ধীরে রাস্তা পার হতে শুরু করে।
রিকশাচালক ঘণ্টা বাজায় এবং লোকটাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কোথায় যাবেন?’
কিন্তু আগন্তুক কোনো উত্তর দেয় না। রিকশাচালককে হুট করেই অদ্ভুত এক ধরনের অস্বস্তি গ্রাস করে।
তারপরও সে সাহস করে সেই লোকটার কাছাকাছি চলে যায়।
কুয়াশার কারণে লোকটার মুখে দেখা যাচ্ছিল না। তবে রিকশাওয়ালা খেয়াল করে যে, লোকটার পা ঠিক মাটি স্পর্শ করছে না...
ভয়ে রিকশাচালক মুখে ফিরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ পর আবার তাকায়, কিন্তু দেখে যে রাস্তায় কেউ নেই!
রিকশাওয়ালার এ গল্প গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর একই ধাঁচের আরও বেশ কয়েকটি কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে।
কেউ বলত, গভীর রাতে মোটরসাইকেল চালানোর সময় হঠাৎ সামনে একজন মানুষ এসে দাঁড়ায়। ব্রেক কষে থামার পর দেখা যায়, রাস্তা পুরো ফাঁকা।
কেউ বলত, সাদা পোশাক পরা এক পথিক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে লিফট চায়। কিন্তু গাড়ি থামিয়ে পেছনে তাকালে আর কাউকে দেখা যায় না।
সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল এক ট্রাকচালকের। তার ভাষ্য, এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে সে দেখে যে, একজন লোক রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত ব্রেক চাপে। ট্রাক থেমে গেলে লোকটি ধীরে ধীরে তার দিকে মুখ তোলে।
ট্রাকচালক অবাক হয়ে খেয়াল করে যে, লোকটির শরীরে মাথা নেই! অদ্ভুতভাবে নড়ে ওঠে সেই মাথাহীন শরীরটা। পরমুহূর্তেই কুয়াশায় মিলিয়ে যায় অবয়বটি।
ট্রাকচালক কোনোমতে শহরে ফেরে। এরপর তার সেই অদ্ভুত কাহিনি ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। আশি আর নব্বইয়ের দশকের কিছু পত্রিকায়ও লেখালেখি হয়েছিল সেই ‘মাথাহীন পথিক’কে নিয়ে।
এখনো নাকি হঠাৎ কোনো শীতের রাতে বাস আর ট্রাকচালকরা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে। ওরা সবাই খেয়াল করে, মহাসড়কের এক নির্জন স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাদা পোশাক পরা একজন লোক। লোকটা একদম
স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, একটু নড়ে না।
সে কারও ক্ষতি করে না। শুধু অপেক্ষা করে! কিন্তু কার জন্য এ অপেক্ষা? তা কেউ জানে না!
রাস্তার ঘটনা তো বললাম, এবার এক বাড়ির গল্প। রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক থেকে খানিকটা দূরেই অবস্থিত বাড়িটি। বাড়িটার একটা নামও রয়েছে, কিন্তু যেহেতু সেটা প্রাইভেট প্রপার্টি, তাই নামটা বলতে পারছি না।
বহুতল ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল ২০১০ সালের দিকে। সাততলা ভবনটির একতলায় ছিল গ্যারেজ, দোতলায় ভাড়া দেওয়া হয় একটি অফিস এবং বাকি পাঁচটি তলার দুটি ইউনিটের প্রতিটি একটি করে পরিবারকে ভাড়া দেওয়া হয়। অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটে পাঁচতলার ডানদিকের ইউনিটের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে।
এক দম্পতি তাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয়। মেয়েটির বয়স তখন ছিল চার বছরের মতো। শুরুর দিকে তেমন কোনো ঝামেলা হয়নি। তবে ভদ্রমহিলা মাঝেমধ্যে একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করতেন... তাদের ফ্ল্যাটটা যেন একটু বেশিই ঠান্ডা। এপ্রিল মাসের গরমেও রাতের বেলা তাদের গায়ে কাঁথা দিয়ে ঘুমাতে হতো। তবে ব্যাপারটা কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি।
মূল সমস্যা শুরু হয় ঠিক এক মাস পর। ভদ্রমহিলা হুট করেই খেয়াল করেন, রান্নাঘরের দেয়ালে মাঝেমধ্যেই রঙিন কতগুলো ছোট ছোট হাতের ছাপ ফুটে ওঠে। বাচ্চা মেয়েটাকে কিছুদিন আগেই জলরঙের একটা সেট কিনে দেওয়া হয়েছিল। তাই ভদ্রমহিলা ভেবে নেন, হয়তো বাচ্চা মেয়েটাই হাতে রঙ মেখে এসে এমনটা করে। হাতের ছাপগুলো ফুটে উঠত ঠিক বিকালবেলায়। পরে আবার মিলিয়ে যেত।
পরদিন দুপুরবেলায় সেই ভদ্রমহিলা না ঘুমিয়ে নিজের মেয়েকে চোখে চোখে রাখেন এবং তিনি দেখেন, মেয়েটি একবারও রান্নাঘরের দিকে যায়নি।
বিকালবেলা রান্নাঘরে গিয়ে ভদ্রমহিলা রীতিমতো চমকে ওঠেন। কারণ, দেয়ালে সেই ছোট ছোট রঙিন হাতের ছাপ!
সেদিন রাতেই নিজের স্বামীকে সবকিছু খুলে বলেন তিনি। ভদ্রলোক শুরুর দিকে ব্যাপারটা পাত্তা দেননি। তারপর শুক্রবার তিনি নিজে মেয়েকে চোখে চোখে রাখেন, তারপর রান্নাঘরে গিয়ে সেই অদ্ভুত হাতের ছাপ দেখে চমকে ওঠেন।
এবার ব্যাপারটা নিয়ে তারা দুজন বাড়িওয়ালার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, কিন্তু বাড়িওয়ালা কিছুই বিশ্বাস না করে উল্টো তাদের ওপরই মেজাজ দেখান। এরপর ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে একজন মাওলানাকে ডেকে আনেন। সেই মাওলানা বেশ কিছুক্ষণ বাড়িটা ঘুরে দেখেন, তারপর ডাইনিং স্পেসের বেসিনের নিচে বিশেষভাবে লুকানো একটি নকশা এবং তাবিজ বের করেন। এরপর তিনি বাড়ি বন্ধ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পরও তা পারেন না। এরপর তিনি ভদ্রলোককে জানান, বাড়ির দেয়ালের ভেতরের নানা ফাঁপা জায়গায় আরও অনেক তাবিজ লুকানো-তাই এই বাড়ি বন্ধ করা যাচ্ছে না। আর সেই তাবিজগুলো বের করলেও যে বাড়িটা বন্ধ করা যাবে এমনটা নিশ্চিত নয়, কারণ যে ব্ল্যাক ম্যাজিক করা হয়েছে, তা খুবই ভয়ংকর।
মাওলানার পরামর্শে সেই পরিবার বাড়িটি ছেড়ে দেয়। পরে আরও দুটি পরিবার সেই ফ্ল্যাটে থাকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি।
বর্তমানে ফ্ল্যাটটি আর ভাড়া দেওয়া হয় না, সেটা এখন গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ওই একটা ফ্ল্যাট ছাড়া ভবনের আর কোনো জায়গায়ই কখনো সমস্যা হয়নি।




