স্বর্গের নাম সামাগাঁও

সামাগাঁওয়ের একটি মনাস্ট্রি
বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ পর্বত মানাসলুর ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা দারুণ সুন্দর এক গ্রাম সামাগাঁও। সেখানকার জীবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে লিখেছেন বাবর আলী
পৌনে ১০টা নাগাদ সামদো নামক গ্রাম থেকে চলা শুরু। প্রথমেই গ্রাম পেরিয়ে ঝিরির সমান্তরালে নেমে যাওয়া। হাঁটাপথের বামে ঝিরি। আর ঝিরির গোড়া থেকে পাহাড় উঠে গেছে আকাশে। পাহাড়ের কাঁধ অবধি বার্চ বন। এর পরেই পাথুরে পাহাড়। খাঁজ গলে নেমে আসছে দুগ্ধফেনিভ জলরাশি। আর চূড়ার অংশটুকু মুখ লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। ঝিরির অন্যপাশেও প্রচুর বার্চ গাছ আছে। এখানকার সুউচ্চ পাহাড়গুলো শান্ত সমাহিত নির্বিকারভাবে হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই দাঁড়িয়ে ওরা। এই গম্ভীর মৌনী ভাবের জন্যই লোকের কাছে হিমালয় দেবভূমি।
আমরা এসেছি বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ পর্বত মানাসলু আরোহণের উদ্দেশ্যে। আজকের গন্তব্য এই হাঁটাপথের সবচেয়ে সুন্দর ও বড় গ্রাম সামাগাঁও। পর্বতারোহী হোক কিংবা পর্বত-পদযাত্রী, অতি উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে এখানে সবাই একের অধিক রাত কাটায়।
মাটি ও পাথর মেশানো পথ আর দুপাশে ছোপ ছোপ সবুজ। অনিন্দ্যসুন্দর এই পথ ঠিক যেন ইয়েটসের কবিতা; বাস্তব নাকি জাদু— ঠিক ঠাহর করা যায় না। খুব বেশি চড়াই-উতরাই নেই। মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম সামাগাঁও। ৩ হাজার ৮০০ মিটার থেকে নেমে এলাম ৩ হাজার ৫৩০ মিটারে। বেশ বড়সড় এই গ্রামকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকের নামচে বাজারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। উচ্চতায়ও এ দুই গ্রামের প্রায় সহাবস্থান। তবে নামচের মতো গিয়ার শপ কিংবা ঝাঁ চকচকে ক্যাফে নেই। বদলে আছে তিব্বতি জীবনধারার শান্ত-সমাহিত রূপ।
আনুমানিক পঞ্চদশ আর ষোড়শ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে তিব্বত থেকে লোকজন এসে গ্রামের পত্তন করে
গ্রামে ঢোকার মুখেই সুন্দর একটা স্তূপা। কিছুটা এগিয়ে তাশি দেলেক নামক সুন্দর একটা লজে উঠলাম। কাচের জানালার ওপাশে ততক্ষণে ঝকঝকে রোদ উঠেছে। দুপুরে ডাল-ভাত খাওয়ার ফাঁকেই চারপাশ কাঁপিয়ে হেলিকপ্টার এলো। দুই পাহাড়ের মাঝের এক করিডর ধরে সামাগাঁওতে হেলিকপ্টার আসে। সেটি মেঘে ঢাকা থাকলে কাঠমান্ডুর সঙ্গে হেলি যোগাযোগ সম্ভবপর হয় না।
সামাগাঁও থেকে মানাসলু বেস ক্যাম্প অবধি মালবহনের কাজ করেন এই গ্রামের স্থানীয়রা। গ্রামবাসীর একটা সমিতি আছে। যার কিংবা যাদের সিরিয়াল আসবে, তারাই বেস ক্যাম্পে যাবে মালবাহক হিসেবে। এই গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মালবহনের কাজ করে।
আমেরিকান বন্ধু ক্রিসের সঙ্গে পাড়া বেড়াতে বেরোলাম।
গ্রাম জুড়ে অনেক টি হাউজ। পর্বতারোহী আর পর্বত-পদযাত্রীদের বেসিক থাকা-খাওয়ার সুবিধা মেলে এখানে। বেশিরভাগ দোকানেই গ্রামের চমরী গাইয়ের দুধ থেকে বানানো চিজ মেলে। অধিকাংশ বাড়িই পাথরের তৈরি। স্থানে স্থানে বিশাল সব প্রার্থনা চাকা আর মণি দেয়ালের ছড়াছড়ি। গ্রামের লোকেরা মূলত চাষাবাদ আর চমরী গাই পালন করে। মাঝেমধ্যে খচ্চরের সাহায্যে মালবহনের কাজ করে। ট্রেকিং আর ক্লাইম্বিংয়ের মৌসুমে নিজেরাও গতর খাটিয়ে মালবহনের কাজ করে।
সামাগাঁও গ্রামের অধিবাসীদের শিকড় তিব্বতে। আনুমানিক পঞ্চদশ আর ষোড়শ শতাব্দীতে এই অঞ্চলে তিব্বত থেকে লোকজন এসে গ্রামের পত্তন করে। তবে গ্রামের অধিবাসীদের ‘তিব্বতি’ বললে ওরা খানিকটা অপমানিত হন। নিজেদের ‘নুব্রি’ বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সিংহভাগ নুব্রিরা বাদেও তামাং আর গুরুং জাতিসত্তার মানুষ থাকে এই গ্রামে।
হাঁটতে হাঁটতে গেলাম গ্রামের হেলথ পোস্টে। ক্রিস কাঠমান্ডু থেকেই পেটের পীড়ায় ভুগছিল। হেলথ পোস্টের ঠিক পেছনেই হেলিপ্যাড। পাথরের বাড়িগুলোর ফাঁকে ফাঁকে আছে পশু চারণভূমি আর চিলতে সব ফসলের ক্ষেত।
বুড়ি গন্ডকি উপত্যকার গোর্খা জেলায় অবস্থান সামাগাঁওয়ের। মাথার ওপর ছায়ার মতো লেপ্টে আছে বিশ্বের অষ্টম সর্বোচ্চ পর্বত মানাসলু। সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রথাগুলো অনেকাংশেই এখনো অক্ষত। প্রজন্মান্তরে সম্পদের ভাগ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে এই গ্রামের অল্প কয়েকটি পরিবার এখনো বহুপতিত্ব (একই নারী কর্তৃক একই সময়ে বহুপতি গ্রহণ; একই পরিবারের সব ভাইয়ের এক স্ত্রী) প্রথা চালু আছে। যদিও সংখ্যাটা অতি নগণ্য।
বিকালের গন্তব্য লোটাস ফিট অব মানাসলু হেরিটেজ গুম্ফা। অভিযানের সফলতার উদ্দেশ্যে পূজা দেওয়ার জন্যই পাহাড় চূড়ার মনাস্ট্রির পথ ধরলাম। কিছুদূর উঠতেই উল্টোদিকের একটা পাহাড় নজর কাড়ল। নাম রয়েল বাহরাইন পিক। বাহরাইনের রাজদুলাল মানাসলু আরোহণের পর তার দেশের নামে এই পাহাড়ের নামকরণ করে গ্রামবাসী। গ্রামের শেষ মাথা থেকে গুম্ফার চূড়া অবধি মিনিট পনেরোর হাঁটাপথ। পাথরের ওপরে মাটির প্রলেপ দেওয়া দেয়ালে ঘেরা লোটাস ফিট গুম্ফা। জুতা খুলে অভ্যন্তরে কাঠের মেঝেতে পা রাখতেই ঠান্ডায় পা অসাড় হওয়ার জোগাড়। পদ্মসম্ভবার নানান আকারের মূর্তি আছে অভ্যন্তরে।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একজন থুড়থুড়ে লামা এলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলে কী হবে, চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। সামাগাঁও গ্রামের নিকটবর্তী অন্য দ্রষ্টব্য হলো ৩ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত বীরেন্দ্র লেক। নেপালের সাবেক রাজা বীরেন্দ্রর নামে নামকরণ করা হয়েছে এই লেকের। নিজ পুত্রের গুলিতে প্রাণ হারানোর প্রায় ২৪ বছর আগে ১৯৭৭ সালে নেপালের তৎকালীন নৃপতি বীরেন্দ্র এখানে আসেন হেলিকপ্টারযোগে।
ফেরার পথে চোখে পড়ল মিলারেপা মেমোরিয়াল পিস গার্ডেনের ছোট্ট একটা সাইনবোর্ড। গ্রামের মূল রাস্তা থেকে সরু একটা পথ ধরে অল্প এগোতেই মহাযোগীর বিশাল মূর্তি। লম্বা চুলের হাড় জিরজিরে মিলারেপা ধ্যানি ভঙ্গিতে চেনা মুদ্রায় বসা। দেবদর্শনজনিত আনন্দ নিয়ে লজে ফিরলাম।





