বৈঠা বেয়ে স্কুলযাত্রা

হাওরে ঝুম বৃষ্টিতে। ছবি: শরিফ হোসেন আসিফ
বর্ষার রূপ দেখতে হাওরের জুড়ি মেলা ভার। যেদিকে চোখ যায় অথৈ জলরাশি। ছোট ছোট গ্রাম হাওরের পানির ওপর দ্বীপের মতো ভাসতে থাকে। আমার শৈশব, কৈশোর ও বেড়ে ওঠা সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার সরসপুর গ্রামে। হাওর অঞ্চলে বর্ষা স্থায়ী হয় প্রায় চার মাস। জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র। হাওর অঞ্চলে বলা হয়ে থাকে এখানে ছয় মাস বর্ষা বা বাইস্যাকাল বা অদিন, আর ছয় মাস সুদিন বা শুকনো সিজন।
কত স্মৃতি মনের মুকুরে নাড়া দেয় বর্ষা এলে। হাওরপাড়ের স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে কীভাবে স্কুলে যাওয়া-আসা করত, তা শুনলে অনেকের কাছেই গল্পের মতো মনে হবে। বিশেষ করে যে মানুষ হাওরে বসবাস করেনি, তার কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার মনে আছে, তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। শাসখাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি। আমার নিজ গ্রাম সরসপুরের পর বিলপুর গ্রাম, তারপর শাসখাই গ্রাম। বর্ষার সময় আমাদের এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। তখন বর্ষার ঢেউ তথা আফালের ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য বাড়ির চারপাশ ঘিরে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তার ভেতরে চাইল্লা বন দিয়ে ঠেসে দেওয়া হতো। বর্ষা এলে দুই-তিন হাঁটি (পাড়া) বা এক গ্রামের সবাই মিলে স্কুলে যাতায়াতের প্রয়োজনে কয়েক মাসের জন্য নৌকা কেরায়া বা ভাড়া করতাম।
গ্রামের সবাই মিলে স্কুলে যাতায়াতের প্রয়োজনে কয়েক মাসের জন্য নৌকা ভাড়া করতাম
প্রত্যেক ছাত্রের নিজস্ব বৈঠা থাকত। সবাই বৈঠা বেয়ে স্কুলে যেতাম। আবার স্কুল ছুটি হলে বৈঠা বেয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম। সঙ্গে ওই গ্রামের বা পাশের গ্রামের কোনো শিক্ষক থাকলে তিনি নৌকায় করে ছাত্রদের সঙ্গে স্কুলে যেতেন-আসতেন অভিভাবক হিসেবে। যে ছাত্রদের বাড়ি সবচেয়ে দূরে সেখান থেকে নৌকার যাত্রা শুরু হতো। পথে হাঁটিতে হাঁটিতে নৌকা ভিড়িয়ে ছাত্রদের নৌকায় তুলে নেওয়া হতো। নৌকায় উঠেই প্রথম কাজ যার যার বৈঠা দিয়ে নৌকা বাওয়া। শাসখাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অবনীমোহন আচার্য স্যার খুব প্রিয় ছিলেন আমাদের। অঙ্কের মনোরঞ্জন স্যার খুব কড়া ছিলেন।
এভাবে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি পাস করলাম। ভর্তি হলাম হাই স্কুলে। সেই হাই স্কুল আবার আমার নিজ গ্রামে। শ্যামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়। আমার হাঁটি থেকে দুই হাঁটি পরে। তবুও বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় ছিল না। সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতোই আমরা ছাত্ররা বৈঠা বেয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম। অবশ্য এখন হাওরের অনেক শিক্ষার্থীরই নৌকা লাগে না স্কুলে যেতে। অনেক রাস্তাঘাট হয়েছে। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। তবে বর্ষায় শিশুকালের সেসব স্মৃতি ভুলতে পারি না।




