ভয়ংকর সুন্দর

তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় শৈশবে, বয়স তখন ৮ কিংবা ৯। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। গরমের দিনে ঘুমানোর আগে বাবা গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ির আঙিনায় ইজি চেয়ারে বসে থাকতেন। শীতল হাওয়ায় শরীর ঠান্ডা হলে ঘুমাতে যেতেন। সেই রাতে বাবা বসেছিলেন ইজি চেয়ারে, আমি পাশের বেঞ্চিতে। এ সময় তারার আলোয় একটা কিছুকে বাবার দিকে এগিয়ে যেতে দেখেই নিজের অজান্তে চিৎকার করে বলে উঠলাম, ‘বাবা, সাপ!’
বাবা সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে পড়ে কাছের গোয়ালঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে রাখা বাঁশের খুঁটি এনে সাপটাকে পিটিয়ে মেরে ফেললেন। আমি তখন বেঞ্চের ওপর দুই পা উঠিয়ে বসে রীতিমতো কাঁপছিলাম। টর্চের আলোয় দেখলাম, বাবার সামনে মরে পড়ে আছে প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা কালো রঙের বিরাট এক সাপ। তার দেহে নানা ধরনের সাদা-কালো দাগ। বাবা বললেন, ‘এটা হলো কালো গোখরা, ভয়ানক বিষধর আর ভীষণ তেজি।’
তারপর বহুবার একে দেখেছি, মঙ্গল আর শুক্রবারে, বাড়ির পাশের চরসিন্দুর হাটে। বেদেরা একে নিয়ে আসত তাদের মজমার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে। মাঝেমধ্যে তার বাক্সটা খুলে ধরত বেদে, ভেতর থেকে ভয়ানক ফোঁস ফোঁস শব্দ ভেসে আসত। উঁকি দিলে দেখা যেত কালো রঙের খ্যাপাটে সাপ। আমরা ভয়ে শিউরে উঠতাম। এরপর মজমার শেষের দিকে বের করা হতো প্রধান আকর্ষণ। সে বারবার বেদের দিকে তেড়ে আসত, বেদে বিন বাজিয়ে তার সঙ্গে খেলায় মেতে উঠত। তবে তার দেহের বাহারি রঙে কিন্তু আমি রীতিমতো প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।
কৈশোরে এক বর্ষার রাতে টর্চ আর েটঁটা নিয়ে বিলের ধারের ধানক্ষেতে মাছ শিকারে গেলে বন্য পরিবেশে তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। এরপর যৌবনে রাত্রির জলাভূমিতে মাছ শিকার করতে গিয়ে বহুবার তার মুখোমুখি হয়েছি। একটা বিষয় নিশ্চিত হয়েছি, আমার মতো মাছ শিকারি সে। এতক্ষণ যে সাপের গল্প করলাম তার নাম পদ্মগোখরা। ফণার পেছনে পদ্ম ফুলের মতো গোলাকৃতি ছাপ থাকায় মানুষ তাকে এই নামে ডাকে। ইংরেজিতে এরা পরিচিত মনোক্লেড কোবরা নামে। আঞ্চলিকভাবে কেউটে, কালিজাত, জাত সাপ, কাল গোহমা, খরিস, কালা খরিস, কালি গোখরা, কালি পানশ, কুলিম, কাল কুলিম, হানক ইত্যাদি নামে পরিচিত। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে শুরু করে সুন্দরবন, শালবন কিংবা গ্রামীণ বন; মোটকথা প্রতিটি গ্রামে এর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ‘পদ্মগোখরা’ নামে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত একটি বিখ্যাত গল্পও রয়েছে।
এরা অত্যন্ত দর্শনীয় সাপ। গায়ের রঙ কালচে। ঘাড়ের দিকে রয়েছে মোটা কিছু হলদেটে বলয়। ঘাড়ের নিচ থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত খাঁজকাটা সাদাটে বলায়। দেহ জুড়ে এই সাদা-কালোর মিশ্রণ, শিহরণ-জাগানো এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এদের বিভিন্ন রঙে দেখা যায়। কোথাও কুচকুচে কালো, কোথাও বাদামি, কোথাও কালচে হলুদ। তবে ফণার পেছনের মানব চক্ষু আকৃতির ছাপ বা হুড মার্ক দেখে তাকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। একটি পূর্ণবয়স্ক পদ্মগোখরা দৈর্ঘ্যে সর্বোচ্চ ছয় ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রয়োজনে ওরা ছোবলের বদলে কয়েক ফুট দূরের শত্রুর দিকে বিষ ছুড়ে মারতে পারে। পদ্মগোখরার ছোবলে আক্রান্ত ব্যক্তির কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বিকলের পাশাপাশি শ্বাসকার্য ও হৃৎপিণ্ডের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। মূলত নিশাচর সাপ, সন্ধ্যায় এরা মাটির গর্ত কিংবা গাছের কোটর ছেড়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে আসে। ডিমের লোভে প্রায়ই ওরা বসতবাড়ির মুরগির খোয়ারে ঢুকে পড়ে। মিলন ঋতু জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত। স্ত্রী সাপ এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে মাটির গর্তে ১০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। বাচ্চারা পরিপূর্ণ বিষগ্রন্থি নিয়ে জন্মায়। পদ্মগোখরা জোড় বেঁধে চলতে পছন্দ করে। সে ক্ষতিকারক প্রাণী ইঁদুর খেয়ে ফসল রক্ষার পাশাপাশি ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি রোধ করে। তেমনি পদ্মগোখরা শিকার করে নিজেদের ক্ষুধা মেটায় বিভিন্ন জাতের শিকারি ঈগল, কানাকুয়ো, বেজি, গুইসাপ। তাই একে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। কাউকে পদ্মগোখরা ছোবল দিলে কখনোই ওঝা কিংবা কবিরাজের কাছে যাবেন না; সোজা রোগীকে নিয়ে চলে যাবেন জেলা সদর হাসপাতালে। বেঁচে থাক অমূল্য প্রাণ, বেঁচে থাক সুন্দরতম সাপ।



