বাবারা এমনই এভারেস্টের মতো বিশাল

তৃতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে গত ২৭ মে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন নুরুন্নাহার নিম্নি। আগামীকাল রবিবার বাবা দিবস। এ উপলক্ষে বাবা নুরুন্নবী চৌধুরীকে নিয়ে লিখেছেন তিনি
মা-বাবার তৃতীয় ও শেষ সন্তান আমি। মায়ের মুখে শুনেছি, বড় দুই ভাইয়ের জন্মের পরে মা আর সন্তান নিতে চাননি। কিন্তু বাবা একটি কন্যাসন্তান চাওয়ায় আমার জন্ম। বাবার ভীষণ আদর আর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা আমার। কিন্তু আমার স্বল্পভাষী বাবা জানেন না, কীভাবে আদরের কথা, ভালোবাসার কথা বলতে হয়। তাই তো তিনি যখন ৯ মাসে-৬ মাসে একবার গলার মধ্যে বাষ্প জমিয়ে ‘মামণি’ বলে ডাকেন, তখন বুঝতে পারি মানুষটার ভেতরে কী গভীর ভালোবাসা আমার জন্য, কী গভীর মমতা তার বুকের মধ্যে। আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু তার ভালোবাসা টের পায়। আমিও বাবার মতো। ভালোবাসার কথা বলতে গেলে বুকের মধ্যে কেমন ব্যথার অনুভূতি হয়, গলার মধ্যে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আটকে থাকে; বলা হয় না, কোনোদিন বলা হয়নি— ‘বাবা, তোমাকে ভালোবাসি।’ কিন্তু আমারই তো বাবা, তাই কোনোদিন না বলা এই কথা বাবা বুঝতে পারেন, তীব্রভাবে অনুভব করেন, জানেন।
বাবার আচরণে স্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের ছাপ ছিল। আমাদের তিন ভাইবোনের বয়সের ব্যবধান খুব কম হওয়ায় বাবা আমাদের তিনজনের জন্য একই মাপের, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন রঙের টি-শার্ট নিয়ে আসতেন। এনেই চুপিচুপি আমাকে দিতেন। আমি পছন্দমতো টি-শার্টটি নিয়ে নিতাম। অথচ তখন এই আমি মীনা কার্টুন দেখে পক্ষপাতিত্বের ঘোর বিরোধী। অবশ্য মেয়েদের জন্য বাবাদের ভালোবাসায় একটু পক্ষপাত মেনে নেওয়া যায়।
আমার বাবা এ রকমই। আমাকে একটুও বদলাতে বলবেন না, আমি যে রকম, যা করি সেটাই ঠিক
ছোটবেলায় ঈদ ছিল বিরাট আনন্দের। জামাকাপড় কেনা থেকে উৎসব শুরু হতো। সবসময় মায়ের সঙ্গে মার্কেটে যেতাম। বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে মা পছন্দের জামা-জুতা কিনে দিতেন। বাবা একবার আমাদের ঈদের জামাকাপড় কিনতে রংপুর সুপারমার্কেটে নিয়ে গেলেন। তখনকার দিনে এই মার্কেট ভীষণ জমজমাট ছিল। বাবা আগে কখনো নিয়ে যাননি, তাই আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। ভেবেছিলাম, যা যা পছন্দ হবে, বাবা বুঝি সব কিনে দেবেন। কিন্তু বিধি বাম। বাবা সোজা গিয়ে তার বন্ধুর দোকানে বসে পড়লেন। আমাদের যা যা পছন্দ, সব এই দোকান থেকে নিয়ে নিতে বলে বন্ধুর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলেন। একটা জামাও পছন্দ হয় না। অন্য দোকানে যেতে পারি না, বাবাকেও কিছু বলি না। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটা সেবার ঈদে কম পছন্দের পোশাক পরেছিল শুধু বাবার জন্য, বাবাকে দুঃখ না দেওয়ার জন্য।
বড়বেলায় ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে বাড়ি যাচ্ছি। বাবার জন্য ঈদের পাঞ্জাবি কিনে নিয়েছি, মায়ের জন্য শাড়ি। পাঞ্জাবি কিনেছি নিজের পছন্দে। বাবা সবসময় যে ধরনের পাঞ্জাবি পরেন, সে রকম কিনিনি ইচ্ছা করেই। দুরু দুরু বুকে ভাইয়ের কাছে উপহারগুলো দিলাম বাবাকে দেওয়ার জন্য। পরদিন ঈদ, বাবা পরবেন তো আমার দেওয়া পাঞ্জাবি? বাবা আমার দেওয়া পাঞ্জাবি পরে ঈদের নামাজে গেলেন না। আমি দুঃখ পেলাম, রাগও হলো। নামাজ শেষে ফিরে এসে বাবা পাঞ্জাবিটা পরলেন। হয়তো তার এই বড় হয়ে যাওয়া মেয়েটির মন ভালো করে দেওয়ার জন্য।
ছোটবেলায় আমি ভীষণ দুরন্ত আর ডানপিটে ছিলাম। সারা দিন ছোটাছুটি! স্কুল ছুটির পরে প্রখর রোদে দিনভর পাড়ায় খেলতাম, আবার বন্ধুদের সঙ্গে মারামারিও করতাম। প্রায় প্রতিদিন মায়ের কাছে বিচার আসত। মা আমাকে শাসন করতেন, বোঝানোর চেষ্টা করতেন। একবার খেলতে গিয়ে কার যেন মাথা ফাটিয়ে দিলাম। এক দৌড়ে বাসায় ফিরে লুকিয়ে পড়লাম। জানি, একটু পরেই বিচার বসবে, মা আমাকে বকা দেবেন; দরজা বন্ধ করে আমাকে আটকে রাখবেন, আর কখনো খেলতে যেতে দেবেন না বলে শাসাবেন। কিন্তু সেই পিচ্চির বাবা এসেছেন আমার বাবার কাছে বিচার দিতে। আমি ভীরু চোখে আড়াল থেকে তাকিয়ে আছি। ভাবছি, এবার আর রক্ষে নেই, বাবা আজ আমাকে মেরেই ফেলবেন। কিন্তু উত্তরে বাবা যা বলেছিলেন, তা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। ‘আমার মেয়ে এ রকমই, আমার মেয়ের সঙ্গে আপনার ছেলেকে খেলতে পাঠাবেন না।’
‘আমার বাবা এ রকমই। আমাকে একটুও বদলাতে বলবেন না, আমি যে রকম, যা করি সেটাই ঠিক। নইলে কি এভারেস্টের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে, যেখান থেকে আর ফিরে না-ও আসতে পারি, সেখানে যেতে দিতেন?’ বাবারা এমনই, এভারেস্টের মতো বিশাল।




