দেশের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত লাংলোক

লাংলোক জলপ্রপাত
ওপরে পানে তাকালে দেখবেন, ঝিরঝির করে ঝরে পড়া জলরাশি পাথুরে মাটির দেয়াল থেকে ঝপ করে প্রায় ৪০০ ফুট নিচের ভূমিতে পড়ছে। এই পতনে লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। বাঘেরমুখ পাড়া থেকে উঁচু পাহাড়ি পথ ডিঙিয়ে ৪০ মিনিট সামনে এগোলে দূর থেকে কানে আসে জল পতনের শব্দ। আরও কয়েক মিনিট হাঁটলে ওয়াও! ওই দেখা যায় বিশাল ‘লাংলোক’। লাংলোক বাংলাদেশের উচ্চতম জলপ্রপাত।
লাংলোক ছাড়াও অনেক নাম আছে এই জলপ্রপাতের। কারও কাছে বাদুড় ঝরনা। ‘লিলুক’ নামেও চেনে কেউ কেউ। যে ঝিরি থেকে গড়িয়ে পড়ে জলপ্রপাত হয়েছে, স্থানীয়রা সেই ঝিরিকে চেনে লাংলোক ঝিরি হিসেবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মারমা ভাষায় বাদুড়কে বলা হয় লাংলোক। ঝিরির আশপাশে প্রচুর বাদুড় থাকায় ঝিরির নাম হয়েছে লাংলোক ঝিরি। অতএব, জলপ্রপাতের নামও লাংলোক জলপ্রপাত হয়ে গেল।
নাম যা-ই হোক, তরুণ রোমাঞ্চপ্রেমীদের কাছে লাংলোক দেখে আসাটাই মুখ্য।
লাংলোক জলপ্রপাতের উচ্চতা ৩৮৮ ফুট। মাত্র কয়েক ফুট কম হওয়ায় বাকলাই জলপ্রপাত ‘সবচেয়ে বড় বা উঁচু’র খেতাবটি পেতে পারেনি। দেড় দশক আগেও লাংলোক জলপ্রপাত দেখতে যাওয়া ছিল যেন এভারেস্ট জয়ের মতো! যেমন ঝুঁকি ছিল, তেমনই ছিল রোমাঞ্চকর।
লাংলোকের টানে বারবার ছুটে গিয়েছি সেখানে। তবে আগে যাওয়ার পথ মোটেই সহজ ছিল না। তখন ২১ কিলোমিটার পয়েন্ট ছিল না। জনচলাচলের একটা পথরেখা ছিল শুধু। স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিয়ে ‘কুমারী বন’-এর ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে হতো। এখন সেখানে পাকা সড়ক হয়েছে। পাবলিক বাহন হয়তো চলে না। কিন্তু প্রাইভেট বাহনে চেপে সহজেই যাওয়া যায় তিন্দু বাজার।
ছয় বছর আগে লাংলোক যাওয়ার পথে বাঘেরমুখ পাড়ার কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেছেন, ‘আমরা জানতাম, অনেক দূরে একটি জলধারা আছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ গিয়ে দেখেছেনও। কিন্তু এটিই যে দেশের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত, তা ভাবতেও পারিনি আমরা।’
কেউ কেউ বলেছেন, এখন যেভাবে দলে দলে মানুষ যাচ্ছে, জনকোলাহলে হয়তো একদিন বাদুড়রাও অন্য কোথাও চলে যাবে। বাদুড় ঝরনা (লাংলোক) থেকে যাবে, বাদুড়রা হারিয়ে যাবে।
লাংলোকের অবস্থান বান্দরবানের থানচি উপজেলায়। ভৌগোলিক ভাষায় এটি চিম্বুক পর্বত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। বান্দরবান জেলা সদর থেকে সড়কপথে থানচি উপজেলা হয়ে যেতে হয় লাংলোকে। প্রথমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে বাসে বান্দরবান হয়ে থানচি বাজার আসতে হবে। এখান থেকে সাঙ্গু নদীপথে ইঞ্জিন বোট নিয়ে যেতে হয় তিন্দু বাজার। সেখান থেকে বাঘেরমুখ পাড়া হয়ে ঘণ্টাখানেকের হাঁটা পথ পেরিয়ে লাংলোক জলপ্রপাত। এটিই প্রধান ও সহজ রুট।



