বুড়িগঙ্গার ডলফিন

বুড়িগঙ্গার জলে গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক। ছবি: গবেষক দলের সৌজন্যে
বুড়িগঙ্গার ভয়ানক দূষিত জল দেখলেই গা শিউরে ওঠে। এ পানিতে ডলফিনের মতো একটি প্রাণী টিকে আছে, ভাবা যায়? সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই ডলফিনদের খবর। লিখেছেন ইশতিয়াক হাসান
ছোটবেলায় যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে তিতাস নদ ধরে নৌকায় যেতাম, হঠাৎ হুস করে নদী থেকে আজব এক জন্তুকে লাফিয়ে উঠতে দেখতাম, তখন রীতিমতো অবাক হতাম। এ কী আজব প্রাণী, জলের তল থেকে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠেই কেন, আবার সেখানেই ফিরে যায় কেন? পরে জানতে পারলাম এ আমাদের গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক। পানিতে বাস করলেও এ স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটু পরপর শূন্যে ভেসে উঠতে হয়। এ ছাড়া কর্ণফুলী, সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে ডলফিন দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে বুড়িগঙ্গায় যে এখনো ডলফিন আছে, এটা রীতিমতো অস্বাভাবিক এক তথ্যই।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা নদী আজ শুধুই বর্জ্য আর দূষণের এক উদাহরন। শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, ট্যানারির বিষাক্ত উপাদান এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণে নদীটির জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। এই নদী এখন কোনো জলজ প্রাণী বা মাছের বেঁচে থাকার অনুপযুক্ত। অথচ এ চরম প্রতিকূল পরিবেশে প্রকৃতির এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য রূপকথা হয়ে বেঁচে রয়েছে একদল বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক (Platanista gangetica)।
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষক দল— সুমাইয়া খাতুন, আমীর হামজা, মো. আমিনুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা শ্রাবণী এবং ড. এম এ আজিজের পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নালে প্রকাশিত এ গবেষণায় উঠে এসেছে বুড়িগঙ্গার জলে ডলফিনের সঠিক সংখ্যা, ঋতুভিত্তিক আচরণ এবং বেঁচে থাকার বৈচিত্র্যময় সব কৌশল।
গবেষক দলটির প্রধান সুমাইয়া খাতুনের মাস্টার্সের থিসিসের অংশ হিসেবেই এ প্রজেক্ট।
বসিলায় ডেরা: গল্পের ভেতরে যাওয়ার আগে শুশুক নিয়ে একটি মজার তথ্য জানিয়ে রাখা ভালো। এই ডলফিনরা কিন্তু চোখে প্রায় কিছুই দেখে না! এদের চোখের কোনো লেন্স নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পথ চলা বা শিকার ধরা—সবই চলে সাবমেরিনের মতো অত্যাধুনিক ‘ইকোলোকেশন’ বা শব্দতরঙ্গ (সোনার সিস্টেম) ব্যবহার করে। আর শ্বাস নেওয়ার সময় এরা যখন জলের ওপর ভেসে ওঠে, তখন ‘শুশ..’ করে এক ধরনের শব্দ হয় বলেই এদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘শুশুক’।
এবার আসা যাক বুড়িগঙ্গার মূল গল্পে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষকেরা টানা ১২ মাস (সেপ্টেম্বর ২০২৩-আগস্ট ২০২৪) বিজ্ঞানসম্মত এন-মিক্সচার মডেল ও সরাসরি মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে রীতিমতো চমকে উঠেছেন। ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বুড়িগঙ্গায় এখনো টিকে আছে ২০টি ডলফিন!
গবেষক দলের প্রধান সুমাইয়া খাতুন আর তার শিক্ষক অধ্যাপক আজিজের মুখ থেকে শুনলাম গবেষণার পেছনের গল্প। বুড়িগঙ্গায় মাপমতো নৌকাই জুটছিল না তাদের! হয় বিশাল লঞ্চ, নয়তো এক্কেবারে ছোট ডিঙি নৌকা। শেষমেশ ফতুল্লা থেকে টিনের বডির এক নৌকা ভাড়া করা হলো। পুরো ২৭ কিলোমিটার জুড়েই কিন্তু এদের দেখা মেলে না। গবেষকরা নদীটিকে ছয়টি ভাগে (RS1 থেকে RS6) ভাগ করে দেখেছেন, ডলফিনরা রীতিমতো ‘সেফ জোন’ বেছে নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি শুশুকের দেখা মেলে বসিলা ও খোলামোড়া এলাকায় (কোর জোন, RS2)। এখানকার পানির গভীরতা বেশ ভালো (প্রায় ১৫.৮০ মিটার) আর তলদেশের কোলাহল কম। এ ছাড়া ফতুল্লাসংলগ্ন পাগলা থেকে ধলেশ্বরী সংযোগস্থলেও (RS6), যেখানে গভীরতা ১৮ মিটার, সেখানেও এদের নিয়মিত বিচরণ আছে। গাবতলী থেকে বসিলা (RS1) অংশেও এরা মাঝেমধ্যে ঢু মারে।
গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক মূলত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের স্বাদুপানিতে বাস করে
অন্যদিকে সদরঘাট ও এর আশপাশের টার্মিনাল এলাকা (RS3, RS4 ও RS5) ডলফিনদের জন্য যেন এক মৃত্যুপুরী। প্রতিদিন শত শত লঞ্চ আর কার্গোর গগনবিদারী আওয়াজ এই অন্ধ প্রাণীদের ‘সোনার সিস্টেম’কে অকেজো করে দেয়। মাসে প্রায় ৬৬৫টি বড় নৌযান চলাচলের কারণে চরম শব্দদূষণে এরা এই এলাকা পুরোপুরি এড়িয়ে চলে।
গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক মূলত বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের স্বাদুপানিতে বাস করে। বিশ্বের মাত্র চারটি সম্পূর্ণ স্বাদু বা মিঠা পানির ডলফিন প্রজাতির মধ্যে এরা অন্যতম! এদের ঘাড়ের হাড় জোড়া লাগানো থাকে না। ফলে এরা মাথা ঘোরাতে পারে না, দিক বদলাতে পুরো শরীর ঘোরাতে হয়!
বেঁচে থাকার অদ্ভুত লড়াই: প্রকৃতির এক অদ্ভুত লড়াই চলছে পানির নিচে। গঙ্গেয় ডলফিন স্বভাবতই বেশ লাজুক, সাধারণত একাকী বা জোড়ায় চলতে পছন্দ করে। কিন্তু বুড়িগঙ্গার এই চরম বৈরী পরিবেশ তাদের স্বভাব বদলে দিয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে এখানকার প্রায় ৮১ শতাংশ ডলফিনই এখন দলবদ্ধ হয়ে ঘোরে। এক দলে চার-পাঁচটি, এমনকি সাতটি ডলফিনও একসঙ্গে সাঁতার কাটতে দেখেছেন গবেষকরা। বদলে গেছে খাদ্যাভ্যাসও। এমনিতে ৪-৮ ইঞ্চির ছোট দেশি মাছ এদের দারুণ পছন্দ। কিন্তু দূষণে দেশি মাছ তো প্রায় গায়েব। তাই বাধ্য হয়ে শুশুকগুলো এখন রাক্ষুসে ও কাঁটাযুক্ত বিদেশি ‘সাকার ফিশ’ শিকার করছে!
শীতকালে বা শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গার পানি যখন সবচেয়ে দূষিত আর কম থাকে, তখনই কি না এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়! অবাক হচ্ছেন? রহস্য ভেদ করলেন অধ্যাপক আজিজ। শীতে ডলফিনগুলো তুলনামূলক বেশি ও পরিষ্কার পানির জায়গাগুলোতে জোট বেঁধে থাকে, তাই সহজেই চোখে পড়ে। আর বর্ষায় পানি বাড়লে এরা ছড়িয়ে পড়ে শীতলক্ষ্যা বা মেঘনার দিকে। তবে মেঘনার বেশি গভীরে যেতে পারে না, ভয় ইলিশ ধরার জালের!
শিল্পকারখানার দূষণে শীতলক্ষ্যার অবস্থা বুড়িগঙ্গার চেয়েও ভয়াবহ! সেখানে ডলফিনের সংখ্যা তো কমেছেই, এমনকি মৃত ডলফিনও মিলেছে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে সুন্দরবনের বলেশ্বর, ভৈরব, পশুর, রূপসা এবং বলেশ্বর মোহনা। পাহাড়ি নদীর মধ্যে কর্ণফুলীর নিচের অংশ ও হালদাও ডলফিনদের জন্য চমৎকার জায়গা। সাঙ্গুতেও এখনো কিছু শুশুক টিকে আছে।
শেষ স্পন্দন ও এক চিমটে আশা: এত অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো হলো— ট্যানারির চরম দূষণ আর বিষের মধ্যেও বুড়িগঙ্গায় নতুন শাবকের জন্ম হচ্ছে। বর্তমান শুশুক পরিবারের ৮৪.২১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আর ১৫.৭৯ শতাংশ শাবক। নভেম্বর-জানুয়ারি এবং এপ্রিল-জুনে নতুন শাবক বেশি দেখা যায়।
গবেষক সুমাইয়া খাতুনের জন্য সবচেয়ে মধুর স্মৃতিটি ছিল গত মে মাসের। একটি মা ডলফিন পানির ওপর লাফিয়ে উঠে শ্বাস নিচ্ছিল আর ঠিক তার পাশেই ছোট্ট ছানাও অবিকল মায়ের মতো লাফ দিয়ে শ্বাস নিচ্ছে! এই মায়াবী দৃশ্যটা তার চোখে এখনো লেগে আছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এই ২০টি শুশুক শুধু কিছু প্রাণী নয়, এরা মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গা নদীর হৃৎস্পন্দনের শেষ চিহ্ন। এদের বাঁচাতে এখনই জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি ফেলা বন্ধ করে ইটিপি (ETP) নিশ্চিত করতে হবে। ডলফিনের কোর এলাকায় নৌযানের গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারের নিচে রাখতে হবে। তেলের লোভে ডলফিন শিকার বন্ধে বন বিভাগকে কড়া নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে বলেও মনে করেন অধ্যাপক আজিজ।
মানব শিশুর মতো নিরাপদ হোক ডলফিন, হাতি, বাঘসহ সব বন্যপ্রাণীর ছানা-পোনাদের জীবন। বুড়িগঙ্গার কালো জলে জন্ম নেওয়া ওই ছোট্ট ডলফিন শাবকেরা যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বলে যায়, ‘আমরা বাঁচতে দাও।’




