বয়স বাড়লেই কি ডিমেনশিয়া অবধারিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বয়স্কদের স্মৃতিভ্রম হওয়াকে আমরা স্বাভাবিক ভাবি। কিন্তু ডিমেনশিয়া মানুষের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। লিখেছেন ডা. মতিউর রহমান সুমন
ব্যক্তিগত পরিচয়, পরিবারের বন্ধন, প্রিয়জনের মুখ আর ফেলে আসা জীবনের হাজারো রঙিন মুহূর্ত— সবই এই স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা কিংবা দৈনন্দিন ছোটখাটো কাজ করতেও সমস্যা হতে থাকে, তখন বিষয়টি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিমেনশিয়া’। অনেকে মনে করেন, বয়স বাড়লে স্মৃতিভ্রম হওয়া বুঝি স্বাভাবিক। কিন্তু ডিমেনশিয়া সাধারণ ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়;
ডিমেনশিয়া আসলে কী?
ডিমেনশিয়া কোনো একক রোগ নয়। এটি মূলত কিছু উপসর্গের সমষ্টি, যার ফলে মানুষের স্মৃতিশক্তি, বিচার-বিবেচনা, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর সবচেয়ে পরিচিত ও সাধারণ কারণ হলো ‘আলঝেইমারস’ রোগ। এ ছাড়া মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের সমস্যাজনিত ‘ভাসকুলার ডিমেনশিয়া’, ‘লিউই বডি ডিমেনশিয়া’ এবং ‘ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া’র মতো অবস্থাও এর জন্য দায়ী হতে পারে।
বয়স বাড়লে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি যে বাড়ে, তা সত্যি। সাধারণত ৬০ বছরের পর প্রতি পাঁচ বছরে এই ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে বার্ধক্য মানেই ডিমেনশিয়া অবধারিত। অনেক মানুষ শতবর্ষী হয়েও সম্পূর্ণ তীক্ষ্ণ ও সতেজ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকেন। তাই বয়স বাড়া একটি ঝুঁকির কারণ হলেও আমাদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ এই রোগ মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখে।
প্রায় ৪০ শতাংশ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি আমাদের জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমেই কমানো সম্ভব
ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় যেসব কারণ
ডিমেনশিয়ার পেছনে কিছু কারণ আছে, যা আমরা বদলাতে পারি না, যেমন— বয়স ও জিনগত ইতিহাস। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি আমাদের জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমেই কমানো সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে:
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা ডিমেনশিয়ার পথ তৈরি করে।
অসক্রিয়তা ও স্থূলতা: শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত ওজন রক্তে চর্বি বাড়ায়, যা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বাধা দেয়।
বাজে অভ্যাস: ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান সরাসরি মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব: মানুষের সঙ্গে মেলামেশা না করা বা একাকী থাকা মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর সংযোগ দুর্বল করে দেয়।
শ্রবণ সমস্যা: বয়সের সঙ্গে কানে কম শোনার সমস্যা হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। দীর্ঘদিনের বধিরতা মস্তিষ্ককে বাইরের তথ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রাথমিক লক্ষণ চেনার উপায়
রোগের শুরুতে লক্ষণগুলো এতই সূক্ষ্ম থাকে যে পরিবার তা বুঝতে পারে না। তবে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখলে সতর্ক হওয়া জরুরি:
- সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনা বা তথ্য ভুলে যাওয়া (যেমন— চাবি কোথায় রাখলেন বা দুপুরে কী খেয়েছেন, তা মনে করতে না পারা)।
- পরিচিত রাস্তায় পথ হারিয়ে ফেলা বা দিকভ্রান্ত হওয়া।
- স্বাভাবিক হিসাব-নিকাশ বা পরিচিত দৈনন্দিন কাজ করতে হিমশিম খাওয়া।
- আচমকা মেজাজ পরিবর্তন, অকারণে সন্দেহপ্রবণ হওয়া কিংবা গভীর হতাশায় ডুবে যাওয়া।
প্রতিরোধ ও সুরক্ষার উপায়
ডিমেনশিয়ার শতভাগ নিরাময়যোগ্য ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, তাই ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়’— এই নীতি মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। মস্তিষ্ককে তরুণ রাখতে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তুলুন:
মস্তিষ্কের ব্যায়াম: নতুন কোনো ভাষা শেখা, বই পড়া, ধাঁধা বা সুডোকু মেলানো, দাবা খেলা বা নতুন শখ গড়ে তোলা মস্তিষ্কের ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’ বা মানসিক শক্তি বাড়ায়।
নিয়মিত শরীরচর্চা: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম, যেমন— দ্রুত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা সাইকেল চালানো মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
সুষম খাদ্য: শাকসবজি, ফলমূল, বাদাম, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ এবং জলপাই তেলসমৃদ্ধ ভূমধ্যসাগরীয় খাবার বা ‘মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট’ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য জাদুর মতো কাজ করে।
সামাজিক সংযোগ: পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান, সামাজিক অনুষ্ঠানে সক্রিয় থাকুন। সামাজিক মেলবন্ধন মানসিক অবসাদ দূর করে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: রক্তচাপ, শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন। যেকোনো শারীরিক সমস্যা দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সমাধান করুন।
আমাদের করণীয় কী
আমাদের সমাজে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময় ‘পাগলামি’ বলে উপহাস করা হয় বা অবহেলা করা হয়। এই কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। এটি একটি চিকিৎসাগত অবস্থা, যেখানে রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও অসীম ধৈর্য ও সহানুভূতির প্রয়োজন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বোঝা না ভেবে তাকে ভালোবাসায় ও যত্নে আগলে রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস, এমডি, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।



