দ্রুত চিকিৎসায় স্ট্রোকের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
দেশে প্রতি হাজারে প্রায় ১২ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এর থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। লিখেছেন ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু
স্ট্রোক কী
মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ এটি। স্ট্রোক দুই ধরনের—
ইসকেমিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধলে রক্ত চলাচল কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়ে যায়।
শুরুতে কোষগুলো রক্ত চলাচল কমে গেলেও বেঁচে থাকতে পারে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর মারা যায়। একে বলে কোর।
কোরের চারপাশে মস্তিষ্কের বেশ কিছু অংশেও রক্ত কমে যায়। একে বলে প্যানামব্রা। যদি প্যানামব্রা অংশে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা যায় তাহলে স্ট্রোকের ভয়াবহতা অনেকটা কমানো যায়।
হেমোরেজিক স্ট্রোক: মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালী দুর্বল হয়ে ফেটে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে এ স্ট্রোক হয়। ফলে মস্তিষ্কের ভেতরের কোষে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে, যা রক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং মস্তিষ্কের টিস্যুর মারাত্মক ক্ষতি করে।
কেন হয়
সম্প্রতি ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত এক নিবন্ধনে বলা হয়েছে, মাত্র ১০টি কারণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ৯০ ভাগ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায়। এগুলো হলো—
• উচ্চ রক্তচাপ • ডায়াবেটিস • রক্তে কোলস্টেরলের আধিক্য • স্থূলতা • ধূমপান
• মদ্যপান • হার্টের রোগ • শারীরিক পরিশ্রম না করা • মানসিক অবসাদ • অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস
এসব ছাড়া কিছু কারণ আছে যেগুলোর জন্য স্ট্রোক হতে পারে। যেমন— বয়স বাড়া, বংশে কাছের আত্মীয়দের স্ট্রোকের ইতিহাস থাকা ইত্যাদি। রক্তনালিতে ফোস্কা বা এনিউরিজম বা এভিএম বা রক্তনালি অস্বাভাবিক কমিউনিকেশনের জন্যও স্ট্রোক হতে পারে।
ইস্কেমিক স্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দেওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে যদি রোগী হাসপাতালে আসেন তাহলে এল্টিপ্লেজ দেওয়া যায়
স্ট্রোকের চিকিৎসা
মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধলে রক্ত গলিয়ে ফেলতে এল্টিপ্লেজ নামের একধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
রক্তনালিতে রক্ত জমে বন্ধ হয়ে গেলে তাকে ইস্কেমিক স্ট্রোক বলে। তাদের এল্টিপ্লেজ দেওয়া যায়। তবে সব ইস্কেমিক স্ট্রোক রোগীকে এ চিকিৎসা দেওয়া যায় না। ইস্কেমিক স্ট্রোকের উপসর্গ দেখা দেওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে আসেন তাহলে এল্টিপ্লেজ দেওয়া যায়। অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক হয়। তাদের ক্ষেত্রে এমআরআই পরীক্ষা করে দেখতে হয় এ চিকিৎসা দেওয়া যাবে কি না। যদি এমআরআই পরীক্ষা সন্তোষজনক হয়, তাহলে এ চিকিৎসা দেওয়া যায়। এ ছাড়া রোগীর বয়স ১৮ বছরের কম হলে তাকে এ চিকিৎসা দেওয়া যায় না। ১৯৯৬ সালে এফডিএ স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা হিসেবে এল্টিপ্লেজের অনুমোদন দেয়। তখন থেকেই বিশ্বব্যাপী স্ট্রোকের চিকিৎসা হিসেবে আইভি থ্রোম্বলাইসিস ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের আইভি থ্রোম্বলাইসিস করা হয়েছে তিন মাস পর তাদের ৫০ শতাংশ ব্যক্তি নিজের কাজ নিজেই করতে পারেন, ১৫ শতাংশ অন্যের কিছু সাহায্য দরকার হয়, ১৫ শতাংশ অন্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হন ও ২০ শতাংশ মারা যান।
মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি— স্ট্রোক অত্যাধুনিক চিকিৎসা
ইস্কেমিক স্ট্রোকের রোগী সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এলে তাদের এল্টিপ্লেজ দিয়ে আইভি থ্রোম্বলাইসিস করা যায়। কিন্তু এ সময়ের পর এলেও চিকিৎসা আছে। স্ট্রোকের ছয় ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে নিয়ে আসা হলে অত্যাধুনিক চিকিৎসা করা সম্ভব। এর নাম হলো মেকানিক্যাল থ্রোম্বেক্টমি। রোগীকে ক্যাথল্যাবে নিয়ে হার্টের এনজিওগ্রামের মতো ব্রেনের এনজিওগ্রাম করা হয়। যদি তাতে দেখা যায় মস্তিষ্কের মোটা রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধেছে, তাহলে বিশেষ পদ্ধতিতে জমাট বাঁধা রক্ত টেনে বের করে আনা হয়। ফলে বন্ধ রক্তনালি খুলে যায়। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়। ৭০ ভাগ রোগী এতে সুস্থ হয়ে যান। আমাদের দেশেও এ চিকিৎসা অল্প-বিস্তর হচ্ছে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়
৯০ ভাগ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায়। স্ট্রোকের মূল কারণগুলো প্রতিরোধ করতে পারলে স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায়।
• ধূমপানের ফলে রক্তনালিতে চর্বি জমা হয়ে রক্তনালি বন্ধ করে দেয়। যেকোনো বয়সেই ধূমপান ত্যাগ করা হোক না কেন, তা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
• রক্তচাপ স্বাভাবিকের মধ্যে রাখুন। এজন্য অতিরিক্ত লবণ পরিহার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন।
• হার্ট অ্যাটাক, অনিয়ন্ত্রিত হৃৎস্পন্দন, হার্ট বড় হয়ে গেলে, ভাল্বের সমস্যা ইত্যাদি কারণে রক্ত জমাট বেঁধে তা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। তাই এ রোগগুলোর চিকিৎসা করান।
• স্ট্রোকের সময় রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে মস্তিষ্কে কোষ বেশি পরিমাণে ধ্বংস হয়। এ ছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালিতে চর্বি জমে যায়। ফলে রক্তনালি সরু হয়ে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
• প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খান। প্রতিদিনের খাবারে পাঁচ ভাগের এক ভাগ ফলমূল ও শাকসবজি খান। রেড মিট ও চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করুন।
• আঁশযুক্ত খাবার বেশি বেশি করে খান। অতিরিক্ত ওজন কমান। খাবার খান শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে মিল রেখে। পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার সয়াবিন তেল, মাছের যকৃত খান।
• প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যায়াম করলে রক্তচাপ, রক্তে কোলস্টেরলের মাত্রা কমে ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রেখে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। সপ্তাহে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ মাইল হাঁটুন। এ ছাড়া সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো, নাচা, টেনিস, গলফ খেলতে পারেন।
• রক্তে কোলস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। যদি রক্তে কোলস্টেরল না কমে তবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খেতে হবে।
• জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল রক্তকে ঘন ও জমাট বেঁধে ফেলতে পারে। সেই সঙ্গে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। পিল সেবনের আগে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
লেখক: স্ট্রোক ও ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিনস)




