বিশ্ব স্ট্রোক দিবস
স্ট্রোকের প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ

প্রতীকী ছবি
স্ট্রোক এমন একটি রোগ, যেখানে কয়েক মিনিটের দেরিও একজন মানুষের সারা জীবনের জন্য বড় ধরনের অক্ষমতার কারণ হতে পারে। হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়াকে অনেকে সাময়িক সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন। কেউ কেউ রোগীকে বাড়িতে রেখে তেল মালিশ করেন, পানি বা ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। আবার কেউ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে অপেক্ষা করেন, লক্ষণগুলো নিজে থেকেই কমে কি না। অথচ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে এমন অপেক্ষা বিপজ্জনক।
বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোক নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিই এর মূল কারণ। এবারের স্ট্রোক দিবসের মূল বার্তা—‘Every Minute Counts’, অর্থাৎ প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই জীবন রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা কমানোর অন্যতম প্রধান উপায়।
স্ট্রোক কেন এত বিপজ্জনক?
আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের প্রতিটি অঙ্গের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। কথা বলা, হাঁটা, দেখা, চিন্তা করা কিংবা স্মৃতি ধরে রাখা—সবকিছুর জন্য মস্তিষ্কের কোষে নিয়মিত অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো প্রয়োজন। রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়।
স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমটি ইস্কেমিক স্ট্রোক, যা মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে বা অন্য কোনো কারণে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে ঘটে। দ্বিতীয়টি হেমোরেজিক স্ট্রোক, যেখানে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হয়।
ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে আক্রান্ত অংশে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহুল উদ্ধৃত একটি হিসাব অনুযায়ী, বড় ধরনের ইস্কেমিক স্ট্রোকে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৯ লাখ নিউরন নষ্ট হতে পারে। তবে এই সংখ্যা স্ট্রোকের ধরন, রক্তনালি বন্ধ হওয়ার স্থান এবং আক্রান্ত মস্তিষ্কের অংশের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
এ কারণেই স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় এত গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত রক্তপ্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তত বেশি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।
চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব
ইস্কেমিক স্ট্রোকের চিকিৎসায় বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি রয়েছে—থ্রম্বোলাইসিস ও মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি।
থ্রম্বোলাইসিসে নির্দিষ্ট ওষুধের সাহায্যে রক্তনালিতে জমাট বাঁধা রক্ত গলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণত লক্ষণ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে শিরায় এই ওষুধ দেওয়া যায়। তবে নির্বাচিত কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উন্নত ইমেজিং পরীক্ষার ভিত্তিতে আরও পরে চিকিৎসার সুযোগ থাকতে পারে।
মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি হলো ক্যাথেটার ব্যবহার করে মস্তিষ্কের বড় রক্তনালিতে আটকে থাকা রক্তের জমাট সরিয়ে দেওয়ার আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ শুরুর ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত থ্রম্বেকটমি করার সুযোগ রয়েছে। তবে সবার জন্য এই সময়সীমা প্রযোজ্য নয়; রোগীর অবস্থা, মস্তিষ্কের স্ক্যান এবং আক্রান্ত রক্তনালির অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসার সময়সীমা আছে বলে অপেক্ষা করা যাবে না। যত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব, ততই ভালো। প্রতিটি রোগীর চিকিৎসার সুযোগ ও ফলাফল এক রকম নয়।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন কীভাবে?
স্ট্রোক সাধারণত হঠাৎ শুরু হয়। এর লক্ষণগুলো মনে রাখার সহজ উপায় হলো ‘FAST’।
F—Face (মুখ): হাসতে বললে মুখের এক পাশ বেঁকে যায় কি না, খেয়াল করুন।
A—Arm (হাত): দুই হাত সামনে তুলতে বললে একটি হাত দুর্বল হয়ে নিচে নেমে আসে কি না, দেখুন।
S—Speech (কথা): কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কি না, কথা বুঝতে বা বলতে সমস্যা হচ্ছে কি না, লক্ষ করুন।
T—Time (সময়): এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
এ ছাড়া হঠাৎ এক চোখে বা দুই চোখে দেখতে সমস্যা, শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো, হাঁটতে অসুবিধা কিংবা জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথাও স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।
লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে সেরে গেলেও নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে না। এটি সাময়িক ইস্কেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ হতে পারে, যা পরবর্তী স্ট্রোকের সতর্কসংকেত। এ ক্ষেত্রেও দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
স্ট্রোক হলে কী করবেন?
প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া। সম্ভব হলে এমন হাসপাতালে যেতে হবে, যেখানে জরুরি মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় স্ট্রোক চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
লক্ষণ প্রথম কখন দেখা দিয়েছিল, তা মনে রাখুন। রোগী ঘুম থেকে উঠে স্ট্রোকের লক্ষণ নিয়ে জাগলে তাকে শেষ কখন স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গিয়েছিল, সেই সময়টিও চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীকে খাবার, পানি বা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেবেন না। স্ট্রোকের কারণে গিলতে সমস্যা হতে পারে, ফলে খাবার বা পানি শ্বাসনালিতে প্রবেশের ঝুঁকি থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনো ওষুধও দেওয়া উচিত নয়। কারণ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে কিছু ওষুধ পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।
রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না। জরুরি পরিবহনের ব্যবস্থা করুন এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর পথে সম্ভব হলে চিকিৎসাকেন্দ্রে আগাম খবর দিন।
প্রতিরোধেও গুরুত্ব দিতে হবে
স্ট্রোকের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন, শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে স্ট্রোকের চিকিৎসা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে দ্রুত রোগী মূল্যায়ন, জরুরি ইমেজিং, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
স্ট্রোক শুধু একজন রোগীর সমস্যা নয়; এটি পুরো পরিবারের জীবন বদলে দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা রোগীর কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ায় এবং পরিচর্যার জন্য অন্যদের সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়।
তাই স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সময় নষ্ট না করা। লক্ষণ চিনুন, দ্রুত হাসপাতালে যান এবং উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করুন। কারণ, স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ; সময়মতো নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই বদলে দিতে পারে একজন মানুষের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল (নিনস)




