বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস
মাসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা কেন জরুরি?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মে মাসকে বিশ্ব জুড়ে ‘মাসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা মাস’ হিসেবে পালন করা হয়। নারীর সামগ্রিক সুস্থতার অনেকটাই নির্ভর করে মাসিক চক্রের ওপর। এ মাস জুড়ে মাসিক নিয়ে বিদ্যমান কুসংস্কার ও লজ্জা দূর করা এবং নারীর নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করা হয়। নারীদের মাসিক ঋতুস্রাব সাধারণত মাসে গড়ে পাঁচ দিন স্থায়ী হয় এবং মাসিক চক্র বা ঋতুচক্র সাধারণত ২৮ দিন পরপর হয়ে থাকে। এ কারণে প্রতীকী হিসেবে বছরের পঞ্চম মাস মে’র ২৮ তারিখ ‘বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
মাসিক কোনো আড়ষ্টতার বিষয় নয়। এটি নারীর একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। বয়ঃসন্ধির পর থেকেই প্রতি মাসে এই চক্র শুরু হয়। হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জরায়ুর ঝিল্লির পুরুত্ব বাড়ে। একটা সময় সেটি শরীর থেকে রক্ত আকারে বেরিয়ে আসে। আমাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা খুবই দরকার। সেই সঙ্গে প্রয়োজন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মস্থলে নারীর অনুকূল পরিবেশ।
সামাজিক আড়ষ্টতা ও শিক্ষার অভাব
বর্তমানে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে মাসিক ও বয়ঃসন্ধিকালীন বিষয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। সেখানে সবকিছু সুন্দরভাবে বর্ণনা করা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই এ অধ্যায়গুলো পড়ানো হয় না। সামাজিক আড়ষ্টতার কারণে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা এগুলো পড়াতে স্বস্তি পান না। অথচ আমাদের শিশু-কিশোরদের সঙ্গে শিক্ষকদের সম্পর্ক সহজ হওয়ার কথা ছিল। মাসিক যেমন স্বাভাবিক, এ বিষয়ে আলোচনাও তেমন স্বাভাবিক হওয়া উচিত। সামাজিক ও পারিবারিক আড়ষ্টতা এবং সচেতনতার অভাবে অনেকেই সেভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সময়টি পায় না। ফলে শিশু, বিশেষ করে কিশোরীরা অযত্ন এবং অবহেলায় ভোগে।
কিশোরী বয়সের মাসিকের সমস্যা
বয়ঃসন্ধিকালের শুরুতেই মস্তিষ্ক ও ডিম্বাশয় মিলে মেনস্ট্রুয়াল সিস্টেমটি পুরোপুরি তৈরি হয় না। এটি পরিপক্ব হতে কয়েক বছর সময় লাগে। এ কারণে সে সময় কিশোরীদের মাসিকের কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি সাইকেলে অতিরিক্ত রক্তপাত বা সঠিক সময়ে মাসিক না হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ঠিক হয়ে যায়। তবে দীর্ঘসময় মাসিক বন্ধ থাকলে মোটেই সময় নষ্ট করা উচিত নয়। অনিয়মিত মাসিক চক্রের সমস্যাটি শুরুতেই চিহ্নিত হওয়া দরকার। চক্র নিয়মিত হওয়ার পরও দু-তিন মাসের বিরতি দিয়ে মাসিক হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চক্র অনিয়মিত থাকলে তখন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) আছে বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এটি মেয়েদের সবচেয়ে সাধারণ হরমোনের সমস্যা।
পিসিওএস হলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তখন মেয়েদের শরীরে অতিরিক্ত লোম গজায় এবং ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়। এ কারণে মাসে মাসে ডিম্বাণু তৈরি হয় না এবং মাসিক অনিয়মিত হয়। এর সঙ্গে কিছু বাহ্যিক সমস্যাও থাকে। যেমন : গালে বা হাতে-পায়ে অতিরিক্ত লোম বৃদ্ধির কারণে মেয়েরা অস্বস্তিতে ভোগে। পরে এর থেকে বন্ধ্যত্বের মতো জটিল সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তবে শুরু থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে থাকলে এ সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ত্রিশোর্ধ্ব বয়সের মাসিক জটিলতা
মাসিকের দ্বিতীয় ধাপের সমস্যা শুরু হয় সাধারণত বয়স ত্রিশের পরে। কিশোরী বয়সে ডিম তৈরি না হওয়ার যে সিস্টেম ছিল, সেটি বয়স বাড়লে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। উপমহাদেশের মেয়েদের মধ্যে ত্রিশের পর ডিম্বাণুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। এ সময় গর্ভধারণ অসম্ভব না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ৩৫ বছর বয়সের পর অনিয়মিত মাসিক সমস্যাটি বেশি দেখা যায়। এ সময় ধীরে ধীরে চক্রটি বন্ধ হওয়ার জন্য— অর্থাৎ মেনোপজ সিস্টেমে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। তখন ডিম তৈরি না হওয়ার জন্য দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকে। আবার মাসিক শুরু হলে সহজে বন্ধ হতে চায় না। এ সময়টিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে উপকৃত হবেন সবাই।
জরায়ুর টিউমার ও অন্যান্য রোগ
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে অধিকাংশ রোগী আসেন মাসিক-সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে। সেখানে পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস, এডিনোমায়োসিস ও বন্ধ্যত্বের মতো জটিল রোগ নিয়ে কাজ করতে হয় আমাদের। এসব সমস্যার মূলে আছে অনিয়মিত মাসিক। এ ছাড়া চক্র অনিয়মিত হলে অনেক সময় গর্ভাবস্থায় বৃদ্ধি ঠিকঠাক হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে গর্ভপাত পর্যন্ত হতে পারে। মাসিকের সঙ্গে তীব্র ব্যথা হলে এডিনোমায়োসিস ও এন্ডোমায়োসিসের মতো জটিল রোগ নিয়ে ভাবতে হয় আমাদের। এ ছাড়া ৩০ বছর বয়সের পরে জরায়ুতে টিউমার হতে পারে। এই টিউমার সাধারণত দুই ধরনের হয়। একটি ফাইব্রয়েড এবং অন্যটি এডিনোমায়োসিস। এসব কারণে মাসিকের সময় ব্যথা ও রক্তক্ষরণ বেড়ে যায়। আবার জরায়ুতে পলিপ বা ক্যানসারের কারণেও হতে পারে অনিয়মিত মাসিক।
মেনোপজ-পরবর্তী রক্তক্ষরণ
শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী, মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর কখনো রক্তক্ষরণ হওয়ার কথা নয়। তারপরও যদি রক্তপাত শুরু হয়, সেটিকে বিপদের লক্ষণ হিসেবে ধরতে হবে। এটি ম্যালিগন্যান্সি বা ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। যদিও ১০০ রোগীর মধ্যে মাত্র তিনজনের ম্যালিগন্যান্সির আশঙ্কা থাকে। তাও প্রথমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ম্যালিগন্যান্সি নেই সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। তাই মাসিক বন্ধের পর ব্লিডিং হলে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ও করণীয়
মাসিক একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই মাসিকের অনিয়ম, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র ব্যথা বা বন্ধ্যত্ব— যেকোনো সমস্যাই হোক না কেন, প্রয়োজনে বারবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তার পরামর্শ মেনে নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করে ভালো থাকার উপায়টি খুঁজে নেওয়া দরকার। আর জরায়ুতে কোনো বড় সমস্যা থাকলে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে। সেটি নিয়েও ভয় বা দ্বিধা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। কারণ সুস্থতার বিকল্প কোনো কিছুই নয়।
মাসিকের ছন্দের ওপর নির্ভর করে নারীর ভালো থাকা-মন্দ থাকা। এ চক্রের ওপর চোখ রাখলেই নারীর সামগ্রিক জীবনযাপন ও যেকোনো শারীরিক সমস্যা প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। মাসিক স্বাস্থ্যসচেতনতার ছোঁয়া লাগতে হবে ঘরে ঘরে, প্রতিটি মানুষের মধ্যে। কারণ নারীরা ভালো থাকলে, ভালো থাকবে দেশ।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, রিপ্রোডাক্টিভ, এন্ডোক্রাইনোলজি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়






