খাবারেও বদলে যায় ওষুধের প্রভাব

খাবার ও ওষুধের মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক বা মিথস্ক্রিয়া রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ফুড ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন’। অর্থাৎ, আমরা যে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করছি, তা ওষুধের কার্যকারিতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে, কমিয়ে দিতে পারে অথবা বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
মিথস্ক্রিয়া কী ও কেন হয়?
একটি নির্দিষ্ট খাবার যখন ওষুধের শোষণ, হজম বা শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তখনই ইন্টারঅ্যাকশন ঘটে। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ‘গ্রেপফ্রুট’ বা বাতাবি লেবুর রসই প্রায় ৮৫টির বেশি ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। একইভাবে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, অ্যালকোহল, এমনকি সামান্য পাতিলেবুর রসও ওষুধের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
খাবার ও ওষুধের কিছু সাধারণ মিথস্ক্রিয়া
অ্যান্টিবায়োটিক: টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের সময় দুধ বা আয়রন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে ওষুধের শোষণ কমে যায়। এসব খাবার ওষুধ খাওয়ার এক ঘণ্টা আগে বা দুই ঘণ্টা পরে খাওয়া ভালো। আবার অ্যামোক্সিসিলিন বা পেনিসিলিনের ক্ষেত্রেও খাওয়ার এক-দুই ঘণ্টা আগে বা পরে ওষুধ সেবন করা ভালো। তবে নাইট্রোফুরানটোইন জাতীয় ওষুধ খাবারের সঙ্গেই খাওয়া যায়।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ: যারা ‘ওয়ারফারিন’ জাতীয় ওষুধ খান, তাদের পালংশাক, ব্রকলি বা বাঁধাকপির মতো ভিটামিন-কে সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। কারণ, এই খাবারগুলো ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অ্যানালজেসিক (ব্যথানাশক): প্যারাসিটামল বা অ্যাসিটামিনোফেন জাতীয় ওষুধ খাওয়ার সময় অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ, এটি লিভারের মারাত্মক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।
অ্যান্টিফাঙ্গাল: গ্রিসেওফুলভিন জাতীয় ছত্রাক প্রতিরোধী ওষুধের শোষণ এবং কার্যকারিতা চর্বিযুক্ত খাবারের সাথে গ্রহণ করলে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
অ্যান্টি-কনভাল্সেন্ট: ফেনোবারবিটাল জাতীয় খিঁচুনি রোধকারী ওষুধ সেবনের সময় অতিরিক্ত ভিটামিন-সি ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ, এগুলো ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় বা ঘুম ঘুম ভাব বাড়ায়।
ক্যাফেইন ও অন্যান্য: চা বা কফির ক্যাফেইন ক্লোজাপাইন বা থিওফাইলাইনের মতো ওষুধের সঙ্গে মিলে বুক ধড়ফড়ানি বা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
পজিটিভ মিথস্ক্রিয়া: সব ক্ষেত্রে কিন্তু খাবার ওষুধের শত্রু নয়। যেমন— পাতিলেবুর রসে থাকা ভিটামিন-সি আয়রন সাপ্লিমেন্টের শোষণ বাড়িয়ে শরীরের উপকার করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ
আমাদের দেশে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা প্রকট। অনেকেই আবার ডায়েট বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার সময় ওষুধের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য আছে কি না, তা যাচাই করেন না। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে এই অসতর্কতা ভয়াবহ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মেটফরমিন গ্রহণকারী একজন ডায়াবেটিক রোগী যদি প্রচুর চিনিযুক্ত ফলের রস নিয়মিত পান করেন, তবে ওষুধের কার্যকারিতা কমে রক্তে শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যেতে পারে।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
· ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সময় কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে, তা সরাসরি ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নিন।
· ওষুধের প্যাকেটের সঙ্গে দেওয়া নির্দেশিকা বা লিফলেটটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, সেখানে প্রায়ই ফুড ইন্টারঅ্যাকশন সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে।
· ওষুধ কেনার সময় ফার্মাসিস্টকে জানান আপনি নিয়মিত কোনো সাপ্লিমেন্ট বা বিশেষ ডায়েট অনুসরণ করছেন কি না।
· ওষুধের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে সাধারণত খাবারের এক ঘণ্টা আগে বা দুই ঘণ্টা পরে ওষুধ সেবন করা সবচেয়ে নিরাপদ।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক



