বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস
‘আর্লি পিউবার্টি’ নিয়ে দুশ্চিন্তা নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইদানীং দেখা যায়, আট-নয় বছর বয়সেই মেয়েদের মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হয়ে যাচ্ছে। এটি অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে। ঘাবড়ে যান তারা। কী করে বোঝাবেন শিশুকে, কী করেই বা সে সামাল দেবে সব? বাস্তবতার চাপে খাবি খান। অথচ বর্তমানে সিংহভাগ শিশুরই এ বয়সে মাসিক শুরু হচ্ছে। আমরা যারা চিকিৎসক আছি, তারা অসংখ্য শিশুর খবর রাখি; কিন্তু অভিভাবকের কাছে তো এতসব তথ্য থাকে না। ফলে তাদের ঘাবড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
‘আর্লি পিউবার্টি’ কী
গড়পড়তায় ৯-১২ বছর বয়সেই মাসিক শুরু হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের যুগে দেখা যেত ১১-১৩ বছর বয়সে মাসিক শুরু হচ্ছে। ফলে সেই মায়েরা যখন তাদের বয়সের তুলনায় সন্তানদের অপেক্ষাকৃত কম বয়সে মাসিক শুরু হতে দেখেন, তখন ঘাবড়ে যান। এ চক্রটি শুরু হওয়ার সময় মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে সংকেত যায় ডিম্বাশয়ে। সেখান থেকে হরমোন নিঃসরণ শুরু হওয়ার পর শুরু হয় মাসিক চক্র। এরপর শরীরে সেকেন্ডারি সেক্সুয়াল ক্যারেকটারিস্টিক গঠিত হয়।
স্তন বৃদ্ধি, বগল ও শরীরের নিম্নাংশে লোম গজানো ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নারীসুলভ গঠন সৃষ্টি হয়। ১৬ বছর পর্যন্ত চলে এই বৃদ্ধির কাজ। তবে বয়স আটের আগে মাসিক শুরু হলে এবং ১৪ পেরিয়ে যাওয়ার পরও শুরু না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কী কারণে এ পরিস্থিতি
জিনগত, পরিবেশগত ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে মাসিক চক্রের সময়টি কিছুটা এগিয়ে এসেছে। আবার শহর ও গ্রামের তুলনা করা হলে দেখা যায়, পুষ্টিগত কারণে গ্রামে মেয়েদের মাসিক দেরিতে হচ্ছে। সেই তুলনায় শহরে শিশুদের নির্মল বায়ু ও খেলাধুলার মাঠের অভাবই প্রকটভাবে চোখে পড়ে। এখানে শিশুরা অনেকটা বাক্সবন্দি হয়ে শৈশব কাটায়। সারাজীবন এর প্রভাব পড়ে আমাদের মেয়েদের শরীরে।
শৈশবে নিয়মিত খেলাধুলা ও সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকলে হাড়ের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথমটি হাড়ের গঠন শক্তিশালী করে এবং দ্বিতীয়টি অর্থাৎ ভিটামিন ‘ডি’ হাড়ের ঘনত্ব বাড়ায়। সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এলে শরীরে তৈরি হওয়া ভিটামিন ‘ডি’ মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ও হরমোনাল ব্যালান্সের জন্য খুবই দরকারি। বাংলাদেশে বহু স্থানে মেয়েশিশুদের খেলাধুলার ব্যাপারটিকে রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। অথচ জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে শরীরচর্চার মধ্যে রাখা না হলে সারাজীবন এর প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয় তাদের। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, নারীজীবনের এই ভোগান্তির কথাটি সবক্ষেত্রেই থাকে অনুচ্চারিত।
মাসিক চক্র যদি অনিয়মিত হয়
প্রথম দিকে মাসিক চক্র অনিয়মিত থাকার বিষয়টি স্বাভাবিক। শিশুদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থি অপরিণত থাকায় চক্রটি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তা নিয়ে শিশু ও তার অভিভাবকরা চিন্তিত হলে আমরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলি। প্রথম দিকে পিরিয়ডের প্যাটার্ন জেনে এই কাউন্সেলিং সেশনগুলো পরিচালনা করা হয়। এ সেশনগুলোয় মায়েদের বলি, সন্তানের মেনস্ট্রুয়াল ক্যালেন্ডার তৈরি করতে। মেনস্ট্রুয়াল ক্যালেন্ডার অনেক কিছুর নির্দেশক। সেখান থেকে জানা যায়, শিশুর অতিরিক্ত রক্তপাত হচ্ছে কি না বা পুষ্টির ঘাটতি রয়েছে কি না।
মাসিক চক্র স্বাভাবিক করতে শিশুর খেলাধুলা ও শরীরচর্চার বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশপাশি সুষম পুষ্টির বিষয়টিও জরুরি। ফাস্টফুড ও কোমলপানীয়ের মাত্রা নির্ধারণ করা দরকার। রাত জেগে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট হয়। এর প্রভাব পড়ে হরমোনের ভারসাম্যে। মাসিক চক্র থেকে শুরু করে সবখানে হরমোনের ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিষয়গুলো তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝিয়ে বলতে হবে। সুষম পুষ্টি ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন হোক আমাদের শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পাথেয়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অবস ও গাইনি, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল






