পেশার ধরন বদলেছে

পরিবারের সঙ্গে লেখক
২০১৯ সালে কানাডায় আসি পিএইচডি করতে। ফেডারেল সরকারের একটি কর্মসূচির আওতায় কানাডা এসেছিলাম। দেশটিতে পৌঁছার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় শুরু হলো করোনাভাইরাস মহামারী। বিধিনিষেধ, সীমিত সামাজিক যোগাযোগ এবং নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেই আমাদের প্রবাসজীবনের প্রথম অধ্যায়টি কেটেছে।
২০২১ সালে আমাদের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। তখন ছোট দুটি সন্তান ও পরিবারের বাস্তবতা মাথায় রেখে পিএইচডির পরিকল্পনা স্থগিত করতে হয়। আমার স্বামীও এ সময় নিজের পেশাগত অবস্থান তৈরি করছিলেন। কানাডায় আমার কর্মজীবন শুরু হয় ২০২২ সালে। ফেডারেল সরকারের একটি পদে চাকরির আবেদন করি। নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করে চাকরিটি পেয়ে যাই। এটি আমার কানাডার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় এরই মধ্যে কানাডার নাগরিকত্বও পেয়েছি। পেশার ধরন কিছুটা বদলালেও গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কটি পুরোপুরি ছেড়ে দিইনি। সুযোগ পেলে এখনো গবেষণামূলক কাজে যুক্ত হই। পাশাপাশি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত যোগাযোগ ও প্রভাববিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করছি। উপযুক্ত সময় ও সুযোগে পিএইচডির পরিকল্পনাটি আবার শুরু করার ইচ্ছা আছে। কানাডায় দীর্ঘ শীত ও হিমাঙ্কের অনেক নিচের তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। তবে কানাডার প্রকৃতি শুধু শীতের নয়। গ্রীষ্মের সবুজ, শরতের রঙিন পাতা, শীতের সাদা প্রকৃতি, বসন্তের নতুন সবুজ, সঙ্গে হ্রদ, বন, পাহাড় ও নদী। চার ঋতুতেই দেশটির আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। এখানে আয় অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য কর দিতে হয়, আবার সরকারি অর্থায়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও হাসপাতাল সেবার সুযোগ রয়েছে। যোগ্য পরিবারগুলো শিশু সহায়তা পেতে পারে এবং যোগ্য শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য অনুদান ও ঋণভিত্তিক আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। সব ব্যয় অবশ্য সরকারি ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। নতুন দেশের রীতিনীতি বুঝতে বুঝতে দেশি মাছ, মসলা আর আদা-রসুন বাটার খোঁজ বের করাও একটা ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বটে। তাই প্রথম এক বছর রুই-কাতলার অভাব মেটাতে কখনো কখনো এদেশি মাছের দিকে তাকিয়েই কল্পনায় সরিষার ঝোল ঢেলে দিতে হয়েছে!
শিশুরা সাধারণত ব্যাগভর্তি বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায় না। প্রাথমিকের প্রথম কয়েকটি শ্রেণিতে তাদের শেখার পদ্ধতিটি অনেক বেশি কার্যক্রমভিত্তিক
সন্তানদের কারণে কানাডার শিক্ষাব্যবস্থাকেও কাছ থেকে দেখছি। এখানে শিশুরা সাধারণত ব্যাগভর্তি বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যায় না। বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেন এবং প্রাথমিকের প্রথম কয়েকটি শ্রেণিতে তাদের শেখার পদ্ধতিটি অনেক বেশি কার্যক্রমভিত্তিক। পরীক্ষার হলে বসে প্রচলিত অর্থে পরীক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষকরা কয়েক মাস পরপর শিশুদের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন দেন। এটি তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে শিশুদের প্রতিদিনের অংশগ্রহণ, শেখার অগ্রগতি ও বিভিন্ন পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে। এই পদ্ধতির ভালো দিক হলো, এতে শিশুরা শুধু বই মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, যোগাযোগ ও সামাজিক দক্ষতা গড়ে তোলার সুযোগ পায়। দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশাপাশি দেখার অভিজ্ঞতাটি তাই আমার কাছে বিশেষ ঘটনা। সারাবিশ্বে কানাডীয়দের বন্ধুবৎসল ও ভদ্র আচরণের সুনাম রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে মানুষের সৌজন্যবোধ, অপরিচিত কাউকে সাহায্য করা এবং ছোট ছোট বিষয়ে ধন্যবাদ ও দুঃখ প্রকাশের অভ্যাস বেশ চোখে পড়ে। পাশাপাশি রাস্তাঘাট, আবাসিক এলাকা ও জনসাধারণের ব্যবহারের স্থানগুলোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশের প্রতি সচেতনতা নজর কাড়ে।
লেখক: কানাডায় ফেডারেল সরকারে কর্মরত



