‘বিদেশের ঈদ কুসুম ছাড়া ডিমের মতো’
- বাংলাদেশি আর আইরিশ— এ দুই পরিচয়ের মাঝখানে নিজের প্রবাস-অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন আশরাফুল হক

আয়ারল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক কথায় অসাধারণ। সবুজ পাহাড়, লেক, সমুদ্রতট সব মিলিয়ে দেশটা যেন ছবির পাতা থেকে উঠে এসেছে
আয়ারল্যান্ডে এসে যে জিনিসটা আমাকে দ্রুত আপন করে নিয়েছে, সেটা হলো মানুষের আন্তরিকতা। অনেকেই বলে আইরিশরা ইউরোপের সবচেয়ে বন্ধুসুলভ জাতি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়ও আমি সেটা টের পাই। অফিসের সহকর্মী হোক বা পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, কেউ না কেউ এক কাপ চা-কফির (এখানে যাকে মজা করে ‘কাপহা’ বলে) আমন্ত্রণ জানাবে। ‘দ্যাটস গ্র্যান্ড’— এ ছোট বাক্যটা যেন আইরিশ জীবনের সারাংশ। যার মানে হচ্ছে, সব ঠিক! ব্যাপার নাহ!
আইরিশদের সঙ্গে আমাদের কিছু মিলও আছে। আমরা যেমন আড্ডা দিতে ভালোবাসি, তেমনি আইরিশরাও গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা আর পাবে বসে দিনের আলাপচারিতায় স্বচ্ছন্দ। দুই দেশের মানুষই তুলনামূলকভাবে ‘লেইড-ব্যাক’— জীবনকে অতিরিক্ত জটিল না করে সহজভাবে নিতে চায়। তাই প্রথম দিকে সংস্কৃতির ফারাক থাকলেও, মানুষের উষ্ণতায় সে দূরত্ব অনেকটাই কমে যায়।
ঈদে বাংলাদেশের কথা হঠাৎ খুব তীব্রভাবে মনে পড়ে। আসলে বিদেশের ঈদ হচ্ছে কুসুম ছাড়া ডিমের মতো। কিছু একটা নাই নাই ফিলিংস
আয়ারল্যান্ডকে বুঝতে গেলে তাদের ‘ইমিগ্রেশন’ (দেশ ছাড়ার) ইতিহাসটাও মনে রাখতে হয়। দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও কাজের অভাব এমন নানা কারণে উনিশ ও বিশ শতকে লাখ লাখ আইরিশ নতুন জীবনের আশায় আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসভিত্তিক কিছু সূত্র বলছে, ১৮২০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আইরিশ অভিবাসীর সংখ্যা সব মিলিয়ে ৬০ লাখেরও বেশি। সেই অর্থে, ‘দেশ ছাড়ার স্বপ্ন’ আয়ারল্যান্ডের জন্য নতুন কিছু নয়, এটি তাদের জাতীয় স্মৃতির অংশ। আয়ারল্যান্ড প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। সবুজ পাহাড়, লেক, সমুদ্রতট সব মিলিয়ে দেশটা ছবির মতো। আয়ারল্যান্ডে জনপ্রিয় অনেক টিভি সিরিজ (ভাইকিংস, গেম অব থ্রোন্স) আর মুভির (স্টার ওয়ার্স, পিএস আই লাভ ইউ) শুটিং হয়েছিল এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই।
তবে সব সুন্দরই সবসময় আসলে যথেষ্ট নয়। প্রবাসে সবচেয়ে বেশি যে শূন্যতা টের পাই, তা হলো পরিবার থেকে দূরে থাকা। ঈদে বাংলাদেশের কথা হঠাৎ খুব তীব্রভাবে মনে পড়ে। আসলে বিদেশের ঈদ হচ্ছে কুসুম ছাড়া ডিমের মতো। কিছু একটা নাই নাই ফিলিংস!
আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটি তুলনামূলক ছোট হলেও সক্রিয়। সারা বছর পহেলা বৈশাখ, ঈদ পুনর্মিলনী, সাহিত্য-আড্ডা, ক্রিকেট ম্যাচ এমন নানা আয়োজন আমাদের সংস্কৃতিকে ধরে রাখে এবং নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেয়।
শিক্ষা ও কাজের সুযোগের ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড বেশ আকর্ষণীয়। বিশেষ করে সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাথমেটিকস এবং স্বাস্থ্য খাতে। দেশটির মাথাপিছু আয়ও বিশ্বে শীর্ষ পর্যায়ের। কিন্তু আবাসন সংকট এখানে প্রকট। ভাড়া বেশি, বাসা পাওয়াও কঠিন। সব মিলিয়ে আয়ারল্যান্ড আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। নতুন দক্ষতা, নতুন বন্ধু, নতুন এক জীবনচর্চা। তবু বাংলাদেশের টান কমেনি। হয়তো একদিন ফিরে যাব। কারণ, প্রথম ঘরের ডাক কখনো পুরোপুরি থামে না। কিন্তু আপাতত আমি কৃতজ্ঞতা নিয়ে বলি, বাংলাদেশ আমার জন্মপরিচয় আর আয়ারল্যান্ড সেকেন্ড হোম। দুই দেশের মাঝখানেই আমার পরিচয় গড়ে উঠেছে।








