বড় ভাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়েছি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আপনার
জন্ম হয়েছিল কোথায়?
ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে ১৯৪৯ সালের ২০ এপ্রিল। তখন আমার বাবা বিএম (বদিউজ্জামান মোহাম্মদ) ইলিয়াস পূর্ব পাকিস্তানের আইনসভার একজন সদস্য (এমএলএ) ছিলেন। সে সময় স্বাস্থ্য বিভাগের মন্ত্রী ছিলেন হাবীবুল্লাহ্ বাহার চৌধুরী। বাবা ছিলেন ওই বিভাগেরই পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি। মিটফোর্ড হাসপাতালে মা মরিয়ম ইলিয়াসের গর্ভে ডাক্তার শিরিন কাজীর হাতে আমার জন্ম। তিনি এবং তার বোন ডা. জোহরা কাজী সম্ভবত প্রথম বাঙালি মুসলমান ডাক্তার।
বাবা নাকি মা— আপনার বেড়ে ওঠার পেছনে কার ভূমিকা বেশি?
মা ছিলেন নিভৃতচারিণী। নিভৃতে থেকেই তিনি পরিবারের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। আমাদের যেটুকু শিক্ষা-দীক্ষা, বলতে পারেন, মায়ের জন্যই হয়েছে। বাবা অনেক সময় জানতেনই না, আমরা কে কোন ক্লাসে পড়ি। মা-ই আমাকে হাতেখড়ি দেন। আমার মনে পড়ে, ক্লাস ফোর-ফাইভ পর্যন্ত তিনিই আমাকে পড়াতেন। মা প্রাইমারি পাস; কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র পড়তেন বিয়ের আগে থেকেই। ওই অভ্যাস তিনি বজায় রেখেছিলেন সারা জীবনই।
বাবা?
বাবা রাজনীতি করতেন, তবে বড়দের রাজনীতির চেয়ে মনে হয় ছাত্র রাজনীতিতেই সফল ছিলেন। নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে বেশ সক্রিয় ছিলেন। ম্যাট্রিক পাস করে ইসলামি জোশে উদ্বুদ্ধ হয়ে আলীগড়ে পড়তে গিয়ে অসুস্থ হওয়ায় বছরখানেকের মাথায় ফিরে আসেন এবং কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। পরে এই কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপিও হয়েছিলেন। তিন-চার বছর পর এই একই কলেজের জিএস হয়েছিলেন শেখ মুজিব। থাকতেন বেকার হোস্টেলে। এই হোস্টেলে কবি বুদ্ধদেব বসু সম্ভবত কিছুকাল হাউজ টিউটর ছিলেন। চুয়ান্ন সালে যখন মুসলিম লীগের পতন ঘটল, বাবা চলে গেলেন বগুড়ায়। তখন থেকে আমি বগুড়ায়। বগুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হই; ক্লাস থ্রি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত ওখানে পড়াশোনা করি। ম্যাট্রিক পাস করে ওখানে আজিজুল হক কলেজ আছে, এখন সরকারি, তখন বেসরকারি ছিল, সেখানে পড়ালেখা করেছি। ইন্টারমিডিয়েটে মানবিক বিভাগে মেধাতালিকায় রাজশাহী বোর্ডে পাঁচ নম্বরে ছিলাম।
ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলেন কবে?
১৯৬৭ সালে। ইংরেজিতে।
ইংরেজি পড়েছেন কেন?
যেহেতু আমার সাহিত্যে আগ্রহ ছিল বেশি, বাংলায় হয়তো পড়তাম। কিন্তু অনেকেই ডিসকারেজ করল— চাকরির স্কোপ কম। তখন ইংরেজির দাম ছিল। পাস করে অনেকেই সিভিল সার্ভিসে যেত। এ জন্যই ইংরেজি পড়া। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে থাকতাম।
প্রিয় শিক্ষক?
ড. সাজ্জাদ হোসেন আমাদের ইলিয়াড পড়াতেন এবং কে এ মুনিম, আহসানুল হক স্যার ছিলেন। হোসনে আরা হক ছিলেন, তার বাবা স্যার আজিজুল হক, যার নামে আজিজুল হক কলেজ বগুড়ায়। এভাবে কিছু ভালো টিচার পেয়েছি।
শিক্ষক হিসেবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কেমন ছিলেন?
সিরাজ স্যার ভালো এই অর্থে যে তার কথাগুলো নোট করার মতো। ক্লাসরুমে তিনি ছাত্রদের সঙ্গে আই কন্ট্যাক্ট কম করতেন, বিনয়ী এবং লাজুক প্রকৃতির ছিলেন বলেই হয়তো। কিন্তু যা বলতেন, তা টুকে রাখার মতো; টু দ্য পয়েন্ট বলতেন। আর মানুষ হিসেবে তিনি আমাদের অনেকেরই আদর্শ ছিলেন। আমরা ছাত্ররা তাকে খুবই শ্রদ্ধা করতাম।
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন?
১৯৬৯ সালের আন্দোলন পুরোটাই আমাদের ওপর দিয়ে গেছে। আমরা পকেটে ইটপাটকেল নিয়ে পুলিশের দিকে ছোড়ার জন্য নিয়মিত বের হতাম। বড় বড় মিছিল হতো। পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হতো। এ রকম একটা মিছিলেরই সামনের দিকে ছিলেন আসাদ এবং তিনি পুলিশের গুলিতে মারা যান। ইন্টারমিডিয়েটে ভালো রেজাল্ট করায় বৃত্তি পেতাম। সেই টাকা দিয়ে নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে দেদার পুরনো বই কিনেছি।
ছোটবেলায় খেলাধুলা করতেন?
প্রচুর। বগুড়া জিলা স্কুলের টিমে ফুটবল খেলতাম। হকি, ভলিবল, ক্রিকেট খেলেছি। খেলাধুলাতেই বেশি সময় যেত। স্কুলে ক্যাডেট দলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। এসব নিয়ে কাটিয়েছি এবং স্কুলের যেকোনো অনুষ্ঠানে আমার নেতৃত্বে মার্চপাস্ট হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে ফুটবল খেলতাম, বিভাগের দলে খেলেছি। বেশ ব্যস্ত জীবন ছিল। হয়তো এ জন্যই স্বাস্থ্যটা মোটামুটি এখনো ভালো আছে।
স্কুলজীবনে বন্ধুত্ব?
অনেকেই ছিল, যেমন চিশতী শাহ হেলালুর রহমান, যাকে পাকিস্তান আর্মি একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতেই ইকবাল হল রেইড করে মেরে ফেলে। আরেকজন হলো হুমায়ূন আহমেদ। ওর বাবা পুলিশ ইন্টেলিজেন্সে কাজ করতেন। তিনি বগুড়ায় বদলি হয়ে এলে হুমায়ূন জিলা স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি হয় সায়েন্সে। আমরা একসঙ্গে এসএসসি দিয়েছি। ওই সময় আমরা খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি, মানে যাকে বলে হরিহর আত্মা। স্কুল শেষে ও প্রায়ই আমাদের বাসায় আসত। বাসায় ছোট একটা লাইব্রেরি ছিল। ওখান থেকে সে বই নিয়ে পড়ত। আমাকেও কয়েকটি মজার বই পড়তে দিয়েছে। খুবই মেধাবী ছিল। এসএসসিতে সায়েন্স থেকে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করেছিল। প্রচুর বই পড়ত। সাহিত্যের বই। ওর আবার খুব ইন্টারেস্ট ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। প্ল্যানচেট করত। ওর কাছ থেকেই এসবে আগ্রহ সৃষ্টি হলো।
প্লানচেট করেছেন?
একবার আমরা গেলাম বগুড়ায় করতোয়া নদীর ধার দিয়ে মাইল দুয়েক দূরে একটা শ্মশান ছিল সেখানে। কয়েক বন্ধু মিলে বসে প্ল্যানচেট করেছি, অমাবস্যার রাতে কোনো মঙ্গলবার। হুমায়ূনই লিড দিত। যেমন— চক্রে বসে পরস্পরকে টাচ করে থাকা।
এরপর কি আর যোগাযোগ ছিল?
হ্যাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা একসঙ্গে পড়েছি। দুজনেই মুহসীন হলে থাকতাম। ওর প্রথম ও সেরা উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ পড়ে আমার খুব ভালো লেগেছে। বইটির ম্যানুস্ক্রিপ্ট হলে আমার ঘরে বসেই আহমদ ছফার সামনে পড়া হয়েছিল।
আহমদ ছফা সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?
ছফা ভাইয়ের একটা গুণ ছিল, কারও মধ্যে সম্ভাবনা দেখলে খুব উৎসাহ দিতেন। হুমায়ূনের ওই বই তিনিই ছাপার বন্দোবস্ত করেছিলেন। ছফা ভাই আমাকে দিয়েও লিখিয়েছেন। একদিন সত্যেন সেনের ‘পাপের সন্তান’ বইটি এনে দিয়ে বললেন, এটা তুমি পড়ো এবং একটা রিভিউ করে দাও। তিনি নিজেই সেটি ছাপতে দিয়েছিলেন কোনো এক দৈনিকের সাহিত্যপাতায়। কিছুটা বোহেমিয়ান টাইপের মানুষ ছিলেন। শুনেছি, চট্টগ্রামে নাকি বাসের হেলপারের কাজও করেছেন। সেই পর্যায় থেকে উঠে এসেছেন। একেবারে সেলফ মেইড পারসন। দর্শনের কঠিন জিনিসগুলোও বুঝতেন। শোপেনহাওয়ার ভালো পড়া ছিল তার ওই সময়েই। গ্যোয়েটের ফাউস্ট অনুবাদ করেছেন।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ওর ‘নন্দিত নরকে’ আমার কাছে সেরা মনে হয়। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়তে দিয়েছিল, সেটিও ভালো লেগেছে। তখন আমরা হল ছেড়ে চলে গেছি, কর্মজীবনে ঢুকেছি। তো ও আমাকে বইটা পাঠিয়ে লিখেছিল, জানি, তোমার ভালো লাগবে না। কারণ, আমি তো হারমান হেস কিংবা জন স্টেইনবেক না। তবুও একটা রিভিউ করে দিলে খুশি হব। আমি পড়ে ভালো রিভিউ দিই এবং তা একটা দৈনিকের সাহিত্যপাতায় ছাপাও হয়। হুমায়ূনের আগ্রহ ছিল বিচিত্র বিষয়ে। আমাকে কিরো পড়তে দিয়েছিল এবং আমার কিছু হচ্ছে না দেখে একদিন শাহবাগ হোটেলে নিয়ে গেল ১০ টাকা ফিস দিয়ে এক জ্যোতিষের কাছে হাত দেখাতে। আবার সে জাদুবিদ্যাও প্র্যাকটিস করেছিল। একবার টিএসসিতে বেশ ঘটা করে একটা নবীনবরণ অনুষ্ঠান হলো। সেই অনুষ্ঠানে উপাচার্য ওসমান গনি ও আমাদের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ হোসেন ছিলেন। সেখানে দেখি, হুমায়ূন জাদু দেখাতে মঞ্চে উঠেছে। একটা খালি বাক্সের ভেতর থেকে বিচিত্র সব জিনিস বের করছিল। তবে শেষে বেরোল একটা জ্যান্ত মুরগি। মুরগিটা উড়ে গিয়ে পড়ল একেবারে ওসমান গনির পায়ের কাছে।
আপনারা ভাইবোন কয়জন?
চার ভাই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সবার বড়। আমি তার চেয়ে ছয় বছরের ছোট। এর পরের ভাইয়েরা আমার থেকে দুই বছর করে বড়। তবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়েছি।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তো অনেক বড় লেখক।
তার দুটো উপন্যাসই বলব মাস্টারপিস। আমার কিন্তু ‘খোয়াবনামা’ই বেশি ভালো লাগে এবং দুটো বই এত আলাদা ধরনের, তাই না? আমার তো মনে হয় যে, পশ্চিম জগতে এ ধরনের প্রতিভা জন্মালে ওরা মাথায় তুলে রাখত। তার বই দুটো এখানকার চেয়ে বোধ হয় পশ্চিমবঙ্গে বেশি পড়া হয়েছে। সন্দীপন পত্রিকার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে ওরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সংখ্যা বের করল; কভিডের আগে আগে। বিশাল, সাড়ে সাতশ পৃষ্ঠার। বোঝাই যায় খুব দরদ দিয়ে করা।
বড় ভাই লিখত খুব পরিশ্রম করে। ‘খোয়াবনামা’ যখন বেরোল, পরের বছরই তো সে মারা গেল। এর পরের বছর আমি লেখক শিবিরের কিছু তরুণ বন্ধুকে নিয়ে গেলাম বগুড়ায়, খোয়াবনামার সেই কাৎলাহার বিল দেখতে। তো, ঢাকা থেকে যাওয়া ছেলেপেলের ভিড় দেখে স্থানীয় একজন এসে হঠাৎ আমাকে বলে, ‘আপনে আর বছর আচ্চিলেন না?’ এইভাবে বগুড়ার ভাষায় বলছিল, ‘কী সব টুক্যা লিয়্যা গেলেন?’ ও ভেবেছে, আমি বোধ হয় ইলিয়াস।
ভাই হিসেবে তিনি আপনাকে কীভাবে দেখতেন?
খুব স্নেহপ্রবণ ছিল এবং আমাকে অনেক কিছুতে প্রভাবিত করত। ওর নোট বইগুলো পড়া আমার জন্য ছিল খুবই আনন্দদায়ক।
আপনার অন্য ভাইয়েরা?
মেজো ভাই ড. শহীদুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস মারা গেছেন। তিনি কৃষি অর্থনীতিবিদ। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ছিলেন। সেজো ভাই ইঞ্জিনিয়ার নুরুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস। বুয়েটের স্নাতক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ওয়াপদায় এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বছর দশেক কুয়েতেও সরকারি চাকরি করেছেন।
কীভাবে লেখার জগতে এলেন?
যখন প্রথম বর্ষে পড়ি, বড় ভাই ‘ক্রাইস্ট রিক্রুসিফাইড’ নামে একটি বই এনে দিয়ে বলল, এই বইটা পড়ো, ভালো লাগবে। লেখক নিকোস কাজানজাকিস, গ্রিক। পড়ে আমার খুব ভালো লাগল। তার পর থেকে কাজানজাকিস খুঁজতে লাগলাম, পাওয়া যায় না। পরে নানাভাবে খুঁজে তার ‘জোবরা দ্য গ্রিক’, ‘লাস্ট টেম্পটেশন’, ‘অডিসি: এ মডার্ন সিক্যুয়াল’ ইত্যাদি পড়ে একটা প্রবন্ধ লিখলাম। বেশ বড়সড় ও একটু কাঁচা লেখা এবং অডিসি থেকে কোটেশনে ভরা। ওটাই আমার প্রথম বড় আকারের প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধ বাংলার অধ্যাপক আহমদ শরীফ স্যারের বাসায় মাঝেমধ্যে রবিবার বিকালে যে সাহিত্যপাঠ ও আলোচনা হতো, সেখানে পড়েছিলাম। টেক্সট থেকে প্রচুর অনূদিত উদ্ধৃতি শুনে স্যার বললেন, তুমি একে অনুবাদ করে ফেল। কবি হুমায়ূন কবির তখন বাংলা বিভাগে নতুন জয়েন করেছেন। তিনি বললেন, ‘এই মহাকাব্য যে অনুবাদ করবে, সে তো এ রকম একটা বইই লিখতে পারে।’ এই প্রবন্ধ আমি ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. খান সারওয়ার মুর্শিদকেও পড়তে দিয়েছিলাম। মাসখানেক পর ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি তো সুন্দর বাংলা লেখ।’ প্রবন্ধটা নিয়ে নজরুল একাডেমি পত্রিকা অফিসে গেলাম। শাহাবুদ্দিন আহমদ ছিলেন ওটার সম্পাদক। তিনি লেখাটা দেখে বললেন, ‘ঠিক আছে। এটা আমি প্রথম দিকেই ছাপব।’ তখন আমি থার্ড ইয়ারে। দুই সংখ্যায় ছাপা হলো। সেটিই আমার প্রথম উল্লেখযোগ্য ছাপানো প্রবন্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে কীভাবে যোগ দিলেন?
টাঙ্গাইলের কাগমারীতে মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে চাকরি করতাম। তখন নজর রাখতাম ইউনিভার্সিটিতে কোথায় পদ খালি পাওয়া যায়। জাহাঙ্গীরনগরে অ্যাডহকে একটি পদ খালি হলো। সেখানে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী উপাচার্য ছিলেন। আমার অকৃত্রিম সুহৃদ অধ্যাপক আবু তাহের মজুমদার ছিলেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান। আর ইন্টারভিউ বোর্ডেও দেখি আমার প্রিয় সিরাজ স্যার। তো, চাকরি না হয়ে যায় কোথায়? ইংরেজি বিভাগে যোগ দিলাম ১৯৭৮ সালে।
জাহাঙ্গীরনগরের জীবন?
বেশ ভালো কেটেছে। নতুন ক্যাম্পাস, চমৎকার পরিবেশ এবং ভালো লাগার মতো প্রকৃতি। ব্যাচেলরস কোয়ার্টারে থাকতাম। আমি, সেলিম আল দীন এবং মোহাম্মদ রফিক, আমরা রফিক ভাই বলতাম; আমরা তিনজনে খুব মেলামেশা করতাম এবং বহুদিন রাত ১টা-২টা পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগরের যে রাস্তা আছে, একাশিয়া গাছে ভরা; চাঁদ উঠছে, আমরা গল্প করতে করতে সেখান দিয়ে হাঁটতাম। ওই সময়টা খুব ভালো গেছে।
বিয়ে করেছেন কবে?
১৯৮২ সালে, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। আমার স্ত্রী পারভীন খলিল তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে লেকচারার।
পিএইচডি করেছেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে?
ওয়াশিংটন ডিসির হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে, ওটাকে বলা হয় কালোদের হার্ভার্ড। দেশ থেকে যাওয়ার আগেই ঠিক করেছিলাম যে কালোদের সাহিত্য নিয়ে কাজ করব। এখন তো আর কেউ কালো বলে না, বলে আফ্রিকান-আমেরিকান। ওখানে আমি আফ্রিকা থেকে নিই চিনুয়া আচেবেকে, বার্বাডোজ মানে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে জর্জ ল্যামিংকে আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিলাম রিচার্ড রাইটকে। রাইট ও আচেবের দু-তিনটে বই আমি বাংলায় অনুবাদও করেছি।
অধ্যাপনার জীবন?
পিএইচডি শেষে আবার ফিরে আসি জাহাঙ্গীরনগরে। চার বছর পর সহযোগী অধ্যাপক হই। তারও চার বছর পর প্রফেসর। ১৯৯৮ সালে প্রভোস্ট হই কামাল উদ্দিন হলের। এরপর লিয়েন ছুটিতে চলে আসি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। কভিডের আগে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছি। বিভাগীয় প্রধান, ডিন ছিলাম। চীনা সরকার ২০০৬ সালে বাংলাদেশে তাদের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিকেই পছন্দ করে। এই ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক হিসেবে ছিলাম টানা ছয় বছর। সুবিধা একটাই, প্রতিবছর ওরা বেইজিংয়ে বিশ্বের সাড়ে চারশ কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরদের যে সম্মেলন করে, তাতে ওদের উদার আতিথেয়তায় যোগ দেওয়া যায়। এভাবে চীনের বিভিন্ন শহর, কনফুসিয়াসের জন্মস্থান দেখার সুযোগ হয়েছে। চীনের বিত্তবৈভব আর উত্তরোত্তর উন্নতি দেখে বিস্মিত, অভিভূত হয়েছি আর হীনম্মন্যতায় ভুগেছি সব ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যবস্থাপনার দৈন্য দেখে।
(১২ এপ্রিল ২০২৬, উত্তরা, ঢাকা)








