ঢাকার লোকাল বাস, এক নিত্যদিনের ‘রোমাঞ্চ’

পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার— নিয়মানুবর্তী ইউরোপ, আধুনিক আর বৈচিত্র্যময় আমেরিকা, প্রযুক্তিনির্ভর এশিয়া, এমনকি আফ্রিকার তুলনামূলক কম উন্নত দেশগুলোও। দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর সুবাদে নানারকম যানবাহনে ওঠার সুযোগ হয়েছে, অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে বিচিত্র সব ঘটনাও। কিন্তু আমাদের রাজধানী ঢাকার লোকাল বাস আর এদের কান-ফাটানো হর্নের যে যুগলবন্দি, তার তুলনা গোটা বিশ্বেই মেলা ভার!
ঢাকার রাস্তায় পা রাখলেই চোখে পড়বে এক অদ্ভুত দৃশ্য। চারপাশ দুমড়েমুচড়ে যাওয়া, রঙচটা, রিয়ারভিউ মিরর ভাঙা, যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফেরা একেকটি ধাতব যান তীব্রগতিতে ছুটছে। এসব বাস দেখলেই মনে হবে একেকটি চলমান আতঙ্ক। জানালার কাচ নেই, বসার আসনের স্প্রিং বেরিয়ে আছে আর দরজায় ঝুলে আছেন বেশ কয়েকজন যাত্রী। আফ্রিকার অনেক অনুন্নত এলাকায় আমি যাতায়াত করেছি; কিন্তু এমন ‘বিধ্বস্ত বাহন’ সেখানেও চোখে পড়েনি।
এসব বাসের আরেক বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এর হর্ন। ঢাকাই বাসের হর্ন কোনো সতর্কবার্তা নয়, এটি এক ধরনের হুমকি। জ্যামে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেও চালকের আঙুল হর্নের বোতামে লেগে থাকে। সেই হর্নের তীব্রতা ও বিচিত্র আওয়াজ কানের পর্দা ভেদ করে সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত করে। কখনো মনে হয়, তীব্র সাইরেন বাজছে; কখনোবা কোনো আর্তনাদ! সাধারণত এই হর্ন বাজিয়ে সামনের জ্যাম এক ইঞ্চিও নড়ানো যায় না। মাঝখান দিয়ে নীরবে ঘটে যায় জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি।
উন্নত বিশ্বের মানুষ বিনোদনের জন্য থিম পার্কে গিয়ে রোলার কোস্টারে চড়ে রোমাঞ্চ খোঁজে; তাদের শুধু একবার ঢাকার একটা লোকাল বাসে চড়িয়ে দেওয়া হোক। ভাঙা বাসের ঝাঁকুনি, চালকের মরিয়া ওভারটেকিং আর কানের পাশে অবিরাম হাইড্রোলিক হর্নের গর্জন— সব মিলিয়ে যে বাস্তব ‘রোমাঞ্চ’ তারা অনুভব করবেন, তা পৃথিবীর অনেক দেশে টাকা দিয়েও পাওয়া সম্ভব নয়!
এই লক্কড়ঝক্কড় পরিবহনব্যবস্থা আজ ঢাকাকে একটি সুন্দর ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পথে অন্যতম বড় অন্তরায়। যদি আমরা এ বিশৃঙ্খল যান্ত্রিক দানবদের রাস্তা থেকে অপসারণ করে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমাদের তিলোত্তমা ঢাকা একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও অনন্য সুন্দর নগরী হয়ে উঠবে— এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
(লেখক: ভ্রমণপিপাসু এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এ পর্যন্ত ৩৪টি দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন)






