ঢাকার শিকড়ে ঢাকেশ্বরী

অঙ্কন: ফারজিন
ব্যস্ত শহরের কোলাহল পেরিয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পা রাখলেই অনুভবে জাগে হাজার বছরের প্রাচীন এক মায়াময় ইতিহাস। এটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, অসাম্প্রদায়িক বাংলার সংহতি ও ঢাকা শহরের নামকরণের মূল ভিত্তি। ঐতিহ্যের স্নিগ্ধ আলোয় ঘেরা এই পুণ্যভূমির চিরন্তন সৌন্দর্য ও মেলবন্ধনের গল্প লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
লালবাগের ঘুপচি গলির ক্লান্তি কাটিয়ে খাজা দেওয়ান রোডের সরু রাস্তাটি পার হলেই হঠাৎ নাসারান্ধ্রে আছড়ে পড়ে ধূপের মিহি গন্ধ। আর কানে ভাসে হাজার বছরের পুরনো একটি ঘণ্টার ধ্বনি। নিমেষেই সব কোলাহল উধাও হয়ে যায়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অদৃশ্য মায়াজাল। ইট-পাথরের ব্যস্ত ঢাকাকে পেছনে ফেলে এখানে পা রাখলেই মনে হয়, হাজার বছরের কোনো প্রাচীন গল্প যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে চোখের সামনে। বলছিলাম ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের কথা— যা শুধু কোনো পাথরের ইমারত নয়, এই পুরো শহরের আত্মপ্রকাশের প্রথম সুর।
ইতিহাসবিদ আর গবেষকদের কাছে ঢাকেশ্বরী মন্দির শুধু একটি তীর্থক্ষেত্র নয়, এটি ঢাকা মহানগরের অন্যতম প্রাচীন দলিল। শত শত বছর ধরে কত সুলতান এলেন, কত নবাবের রাজত্ব ধুলোয় মিশল, কত বিদেশি দখলদার এলো-গেল; কিন্তু এই লাল-সাদা মন্দিরটি তার চিরায়ত রূপ নিয়ে মাথা উঁচু করে রয়ে গেল এক অটল সাক্ষী হয়ে। ইতিহাসের ধূলি জমে থাকা পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই মন্দিরের জন্মের রয়েছে এক অলৌকিক উপাখ্যান। বুড়িগঙ্গার তীরে যখন আধুনিক সভ্যতার কোনো ছিটেফোঁটাও ছিল না, চারপাশটা শুধুই ঘন গহিন জঙ্গলে ঘেরা— তখনকার কথা। জনশ্রুতি আছে, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন একদিন বুড়িগঙ্গার তীরের গহিন জঙ্গল পার হওয়ার সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আর তখনই তিনি স্বপ্নে দেখলেন মাটির নিচে এক অলৌকিক উপস্থিতি। পরদিন জঙ্গল কেটে মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে এলো এক গোপন দেবীর মূর্তি। মাটির নিচে ‘ঢাকা’ পড়ে থাকা সেই ঈশ্বরীই আজ পর্যন্ত ঐতিহ্যের রক্ষাকবচ হয়ে রাজত্ব করছেন এই প্রাঙ্গণে। ‘ঢাকা’ গোপন জায়গা থেকে দেবী আবির্ভূত হলেন বলে নাম হলো ‘ঢাকেশ্বরী’। জনশ্রুতি আছে, এই দেবীর নাম থেকেই পরে আমাদের আজকের তিলোত্তমা রাজধানীর নাম রাখা হয়েছিল ‘ঢাকা’।
ইতিহাসের সাক্ষী এই মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকতেই লাল-সাদার এক স্নিগ্ধ মায়া আচ্ছন্ন করে ফেলে মনকে। পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ছয়টি প্রাচীন শিবমন্দির যেন অতীতের নীরব প্রহরী। মন্দির ছুঁয়ে থাকা প্রাচীন দীঘির শান্ত জলকে যখন গোধূলির লালচে আলো এসে স্পর্শ করে, তখন জলের বুকে ফুটে ওঠে চূড়ার লাল প্রতিফলন। কনে দেখা সেই আলোয় চুপিচুপি কথা কয় প্রস্ফুটিত পদ্মরা। তাদের সেই গোপন কথা হয়তো কানে যায় ঘাটে বসে থাকা কোনো এক প্রশান্তিপিপাসুর। সন্ধ্যা নামলেই এই পুণ্যভূমি রূপ নেয় এক ভিন্ন মায়াপুরীতে। কাঁসার ঘণ্টা, শাঁখের ধ্বনি আর ঘিয়ের প্রদীপের মাতাল করা সুবাসে এক অলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টি হয় মন্দিরে। সন্ধ্যার আরতিতে যখন ঢাকের ওপর কাঠি পড়ে, তখন সেই বাদ্যের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো পুরান ঢাকা। মনে হয়, এই কাঁসার ঘণ্টা আর ঢাকের আওয়াজেই যেন বিগত এক হাজার বছর ধরে স্পন্দিত হয়ে আসছে আমাদের এই রাজধানী।
তবে ঢাকেশ্বরী শুধু ইতিহাস বা ধর্মীয় উপাসনার কেন্দ্র নয়, এটি অসাম্প্রদায়িক বাংলার এক পরম আশ্রয়। শারদীয় দুর্গাপূজার দিনগুলোতে ঢাকের বাদ্য আর আলোকের ঝরনাধারায় যখন পুরো প্রাঙ্গণ সেজে ওঠে, তখন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো পুরান ঢাকা। ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে এই উৎসব হয়ে ওঠে সার্বজনীন এক মিলনোৎসব, যেখানে নেই কোনো যান্ত্রিক জীবনের তাড়াহুড়ো। আছে শুধু প্রাচীন অশ্বত্থের ছায়া, মাটির খাঁজকাটা দেয়াল আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো পোড়া ধূপের মায়াবী সুবাস। তাই ঢাকেশ্বরী শুধু কোনো অতীত ইতিহাস নয়, এটি যেন এই ধূসর শহরের বুকের ভেতর সযত্নে জমিয়ে রাখা এক টুকরো নস্টালজিয়া।
ঢাকেশ্বরীর প্রাঙ্গণ সবচেয়ে বেশি ঝলমলিয়ে ওঠে শারদীয় দুর্গাপূজায়। এ সময় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির রূপ নেয় রঙ, আলো আর আড়ম্বরের এক মহামিলনমেলায়। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শাঁখের ধ্বনি আর ঢাকের গুরুগুরু বাদ্যে মুখর থাকে পুরো প্রাঙ্গণ। তবে শুধু পূজামণ্ডপে নয়, মন্দিরের সেই আনন্দের স্রোত পৌঁছে যায় পুরো পুরান ঢাকার আনাচে-কানাচে। মুসলিম প্রতিবেশীর হাতে হিন্দুবাড়ির নাড়ু পৌঁছে যাওয়াও সেই আনন্দেরই অংশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তদের পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি প্রদান ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি এখানে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আলোকসজ্জার চোখধাঁধানো প্রদর্শনী। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা এই পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আসেন। তবে ঢাকেশ্বরীর পূজার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এর সার্বজনীনতা— ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে হাজারো মানুষের পদচারণায় এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে না; বরং পুরো দেশের অসাম্প্রদায়িক মেলবন্ধনের এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়।
আধুনিকতার ভিড়ে ঢাকা যখন প্রতিনিয়ত তার পুরনো রূপ হারাচ্ছে, তখনো ঢাকেশ্বরী মন্দির তার অপার স্নিগ্ধতা ও লাল-সাদার ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের শত শত ইটের দালানের আধুনিকতার বড়াইকে দুমড়ে-মুচড়ে ঢাকেশ্বরীর লাল-সাদা প্রাঙ্গণ চুপচাপ সাক্ষী দিয়ে চলে সময় বদলের। গোধূলি সন্ধ্যায় মন্দিরে যখন আরতির প্রদীপ জ্বলে, তখন ঢাকাবাসীর মনে একটাই অনুভূতি জেগে ওঠে— এই শহর শুধু ইটের নয়, এই শহরের বুকে আজও এক আত্মিক নীরবতা ও ঐতিহ্যের সুর বাজে।




