স্লিপলেস সিটি...

কবি গার্সিয়া লোরকার কবিতায় নিউ ইয়র্ক শহর ‘স্লিপলেস সিটি’। সেই কবে কবিতা লিখেছিলেন লোরকা। আজও এই পৃথিবীর শহরগুলো জেগে থাকে লাল চোখ নিয়ে। সেখানে পথের ওপর ঝুলে থাকে ভৌতিক সিগন্যাল বাতি, অন্ধকারের পেটে ছুরি মারে ছুটন্ত গাড়ির হেডলাইট। কোথাও নতুন করে জমে ওঠে মানুষের ভিড়, আবার কোথাও শেষ রাতে হাই তুলে হারিয়েও যায়। রাতজাগা শহরের কিন্তু ঘুম নেই দিনের আলোতেও। নাগরিক জীবন শহরের আত্মাকে কখনো বিশ্রাম দেয় না; কেবল শ্রান্ত করে। এই ঢাকা শহরে বিনিদ্র রাত ফুরিয়ে গেলে আবার গা-ঝাড়া দিয়ে জেগে ওঠে বাস-ট্রাকের ইঞ্জিন, আড়মোড়া ভাঙে খাবারের দোকান, বিশাল মাঠের চারপাশে চক্কর খায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ, কোনো রাস্তার মোড়ে এলিয়ে পড়ে থাকে নিশি-টহল শেষ করা পুলিশের গাড়ি। শহর জেগে ওঠে, নাকি একটি নির্ঘুম রাত্রি অতিক্রান্ত হলে সে তৈরি হয় দিনের আলোকে এনকাউন্টারে পাঠানোর জন্য?
দিনের আলোতে এই শহর তার দালান-কোঠা, বর্ণাঢ্য ভিড়, বিচিত্র জনস্রোত, হৈ-হল্লা, গুজব, আড্ডা নিয়ে তুমুল ব্যস্ত। তখন মনে হয়, শহরের হৃদয়ে কোনো শূন্যতা নেই। শহর মানে আনন্দ, শহর মানে ঔজ্জ্বল্য, শহর মানে প্রাচুর্য। কিন্তু শহরের এই চেনা চেহারাটাই কি আসল সত্য? এই সজ্জা, এই আলো শহরের বাইরের রূপ; তার বেঁচে থাকার অভিব্যক্তি মাত্র। এই শহরের প্রতিটি মুহূর্তকে যে বাসিন্দারা স্পন্দমান করে রাখে তাদের বেঁচে থাকার তীব্র, করুণ গল্পগুলোও শহুরে রূপকথার গল্পে বিষাদময় চরিত্র হয়ে আটকে থাকে। প্রতিদিন বিচিত্র গল্প তৈরি করে শহর। কখনো না খেয়েও বেঁচে থাকার গল্প, শেয়ারবাজারে সূচকের উঠে যাওয়া অথবা নেমে যাওয়ার অবিরাম গল্প, কখনো জুয়াড়ির গল্প, কখনো লম্পটের গল্প, আবার কখনো অফিসযাত্রীর নতমুখের শত গল্প, প্রেমিক-প্রেমিকার গল্প, অতি সামান্যতে খুশি হওয়ার গল্প— সব মিলেমিশে বিশাল এক জগাখিচুড়ি গল্পের নায়ক অথবা নায়িকা যেন এই শহর।
শহরের ধারণার কবে সূত্রপাত? ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ বলেছেন, কৃষিবিপ্লবই শহর সৃষ্টির মূল কারণ। চাষাবাদের প্রয়োজনে একদিন মানুষ একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের এই নির্দিষ্ট বসতি স্থাপন থেকেই গড়ে উঠেছিল শহরের ধারণা।
একটি শহর যেরকম যুদ্ধ, বিপর্যয়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে আবার কখনো মরেও যায়। ইতিহাসের পৃষ্ঠায় হারানো শহরের নাম লেখা থাকে শুধু। তেমনি এক শহরের নাম আটলান্টিস। ইতিহাসে ‘লস্ট আটলান্টিস’ নামেই বেশি পরিচিত। গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখায় ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বে এই শহরের বিবরণ পাওয়া যায়। প্রায় দুই সহস্রাব্দ ধরে আটলান্টিস শহরের হারানো অতীত বহু অভিযাত্রী, গবেষক আর ইতিহাসবিদের চিন্তার বুদ্বুদ হয়ে বেঁচে আছে। প্লেটোর বিবরণ অনুযায়ী, ৯৬০০ খ্রিস্টপূর্বে আগুন আর ভূমিকম্পের ভয়ংকর আগ্রাসনে সপ্রাণ দ্বীপটি একদিন তলিয়ে যায় সমুদ্রে। ফুরিয়ে যায় আটলান্টিস শহরের গল্প। তলিয়ে যাওয়া সেই শহরের খোঁজে বহু অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু গবেষকরা সমুদ্রের তলায় কিছুই খুঁজে পাননি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন চলছে। পৃথিবীর শহরগুলো পিষ্ট হচ্ছে নাৎসি বাহিনীর আক্রমণে। সেই উন্মত্ত সময়ে হিটলার এবং তার অন্যতম সখা জেনারেল গোয়েরিং এক রাতে বার্লিন শহরের উঁচু রেডিও টাওয়ারের ছাদে উঠেছিলেন। হিটলারের শখ চেপেছিল শহর দেখার। হিটলার অন্যমনস্ক হয়ে গোয়েরিংকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এই শহরের মানুষের মুখে হাসি ফুটবে এমন কী কাজ আমি করতে পারি?’
উত্তরে গোয়েরিং বলেছিলেন, ‘আপনি এই ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে পারেন ফুয়েরার।’ হয়তো এ সংলাপ মুখরোচক গল্প, হয়তো সত্যও। গোয়েরিং রসিকতা করেছিলেন হিটলারের সঙ্গে। যুদ্ধের দানব হিসেবে উত্থান ঘটেছিল হিটলারের। তার ট্যাংক বহরের চাকার নিচে পিষ্ট হয়েছিল পৃথিবীর বিখ্যাত সব শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি। নাৎসি বাহিনীর আক্রমণ হাসি মুছে দিয়েছিল প্যারিস শহরের। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ইতিহাসের পাতায় প্রেমের শহর হিসেবেই খ্যাতিমান। প্যারিসকে প্রেক্ষাপট করে লেখা হয়েছে বহু প্রেমের গল্প, তৈরি হয়েছে সিনেমা। সেই শহরটিকে হিটলার ধ্বংস আর কবরের নীরবতায় নিক্ষেপ করেছিল। প্রখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের লেখা ‘টেল অফ টু সিটিজ’ উপন্যাসে প্যারিস শহর বিশাল প্রেক্ষাপট হয়ে আছে। ফরাসি বিপ্লবের ছড়িয়ে পড়া আগুনের মাঝে তিনি উপন্যাসে তৈরি করেছেন ভালোবাসার মানবিক মূর্তি।
কৃষিবিপ্লবের পটভূমি ধরে শহর-কাঠামোর গোড়াপত্তনের কথা ইতিহাসবিদরা যতই বলুক না কেন, সেই শহর থেকে কৃষকরাই সবচেয়ে আগে উৎখাত হয়েছিল। শিল্পবিপ্লব আর যন্ত্রের উত্থান মানুষের আত্মাকে খুন করেছিল সফলতার সঙ্গে। শহর মানেই এক নির্মমতার কাহিনি। শহর মানেই এক রুগ্ণ অথচ আলোকিত লোভের বিস্তার। তাই শহরও বিদ্রোহ করেছে নানা সময়ে। সত্তরের দশকে ইউরোপ জুড়ে তরুণরা রাষ্ট্রক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে পথে নেমে এসেছিল। মানুষের সমঅধিকারের লড়াই উচ্চকিত হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর বহু দেশের রাজপথে।
শহর কি কখনো একা হয়ে থাকে? এত ভিড়, এত কলরোলের ভেতরে শহর কীভাবে একা হয়ে থাকে তার নিজের কাছেও? শহর তো মানুষের বেঁচে থাকার গল্পে অমর হতে চায়। সেখানে জীবনানন্দের নক্ষত্রের নীল আলো, মহাজাগতিক শূন্যতার ভাবনার মতো অতীন্দ্রিয় কিছুর অস্তিত্ব নেই। এই শহরে চাঁদ ওঠে, অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার শহরকে আবৃত করে। এখানে সুখ আছে, সুখাদ্য আছে, সৌন্দর্য আছে, কিন্তু মানুষের পায়ে যন্ত্রণার শৃঙ্খল।




