সুরের মায়ায় ঘেরা এক মসজিদ নগরী

পেশাগত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছুটে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। কাজের ফাঁকে এ পর্যন্ত ঘুরতে পেরেছি এশিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন মহাদেশের ৩৪টি দেশ। দেখেছি ঐতিহ্য, আধুনিকতা আর উন্নত অবকাঠামোর এক চমৎকার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা ভিন্ন ভিন্ন শহর। অজানা বহু কিছু দেখে এবং বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ঝুলিভর্তি করে প্রতিবার যখন দেশে ফিরি, একটি অনুভূতি নতুন করে হৃদয়ে দোলা দেয়— ঢাকার আকাশে-বাতাসে ভেসে আসা আজানের ধ্বনির মতো এমন আত্মিক সুর কি পৃথিবীর আর কোথাও আছে!
ঢাকার রাজপথে হাঁটলে বোঝা যায়, এটি এক অনন্য মসজিদ নগরী। এখানে এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া মেলা ভার, যার কয়েকশ মিটারের মধ্যে কোনো মসজিদ নেই। ফলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় একের পর এক, কখনো একসঙ্গে, কখনোবা ভিন্ন ভিন্ন সুরে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। স্বরের এ বৈচিত্র্যময় লহরী কেবল একটি ধর্মীয় আহ্বান নয়; এটি ঢাকা শহরের নিজস্ব এক ‘শব্দ-পরিচয়’, যা বিশ্বের আর কোনো নগরে এমনভাবে অনুভব করা যায় না।
বিশ্বের অনেক ঐতিহ্যবাহী মুসলিমপ্রধান শহরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। যেমন ইস্তাম্বুল কিংবা দুবাইয়ের মতো সমৃদ্ধ নগরেও আজান হয়, নিয়ম মেনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়। কিন্তু সেখানকার নিয়ন্ত্রিত ও সুনির্দিষ্ট শব্দসীমার কারণে আজানের সুর শহর জুড়ে ঢাকার মতো এত তীব্র ও জীবন্তভাবে প্রকাশ পায় না।
এই আজানের ধ্বনি ঢাকার মানুষকে সারা দিন জুড়ে ভিন্ন ভিন্ন আবহে যুক্ত করে। ফজরের আজান স্নিগ্ধ সুর দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে নতুন একটি দিনের সূচনা করে আর জোহরের ধ্বনি যান্ত্রিক ব্যস্ততার মধ্যে মানুষকে সময়ের গতিপথ মনে করিয়ে দেয়। আবার বিকালে নামতে থাকা ক্লান্তি ছুঁয়ে যায় আসরের আজানে, মাগরিবের সুর বয়ে আনে দিন শেষের সূর্যাস্ত ও নীরবতার বার্তা আর পরিশেষে এশার আজান শহরের সব কোলাহল থামিয়ে মানুষকে এক ধীরস্থির শান্তির আহ্বান জানায়। নগরজীবনের অবিরাম ধকল ও কোলাহলের মধ্যেও এ সুর মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য থামতে শেখায়, একটু ভাবায় এবং আত্মার দিকে নতুন করে তাকাতে উদ্বুদ্ধ করে।
অবশ্যই, একটি আধুনিক নগরের শব্দ ব্যবস্থাপনা, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং সিভিক সেন্স বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই বাস্তবতার পাশাপাশি এটিও ধ্রুব সত্য যে, ঢাকার আজান কোনো সাময়িক বিষয় নয়; এটি এ শহরের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস। কালের পরিক্রমায় তা আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক আবহের এক অবিচ্ছদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
লেখক: ভ্রমণপিপাসু এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এ পর্যন্ত নানা মহাদেশের ৩৪টি দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন






