পৃথিবীর আর কোথায় আছে?
ঢাকা শহরটাকে ছেড়ে আসতে বুকটা চিরে যায়

শামিমা আফরোজ
প্রায় ১৬ বছর আগে ঢাকাকে ছেড়ে এসেছি। ঢাকায় আমার যে অনেক বছর থাকা হয়েছে, তেমনটাও নয়। তবে এইচএসসি পাসের পর যখন ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য ঢাকাতে হাজির হলাম, তখন মনে হয়েছিল আমার প্রিয় শহর ছেড়ে কোথায় এলাম! তবে এ শহরটাকেও যে একসময় ভালোবেসে ফেলব, তা বুঝেছি যখন ঢাকা ছেড়ে দেশের বাইরে চলে আসি।
ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করে আমার চাকরিজীবনেরও কিছুটা সময় কেটেছে ঢাকায়। তবে আমার ছাত্রজীবনের সবচেয়ে মজার সময়টা কেটেছে মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট এলাকাটা যে কী আপন লাগে, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না!
ঢাকায় আমাদের প্রথম বাসা ছিল মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে। একই এলাকায় আমার মামা-চাচা-খালার বাসা। তাই শুক্রবার হলেই চলে যেতাম তাদের কারও বাসায়; চাচাতো-মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে আড্ডা আর মজার মজার খাবার। ধানমন্ডিতে আমাদের বন্ধুদের আড্ডা। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট পরখ করে দেখা। ইয়াম ইয়াম, পানসি, কড়াই গোশত, লায়লাতি, বুমারস— আপাতত এগুলোর নামই মনে পড়ছে।
আমি যখন প্রতিবার দেশে আসার সময় প্লেন থেকে ঢাকাকে দেখতে পাই, আমার মনে হয় এই যে শহরটা, যেখানে সবাই আমার ভাষায় কথা বলে
এখন এগুলো আছে কি না, জানি না। আমি এখন ঢাকার মানুষ, খাবার আর আমাদের কালচারকেই সবচেয়ে বেশি মিস করি। ঢাকার পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন— এগুলো আমি পৃথিবীর আর কোথায় পাব? কে সন্ধান দিতে পারবে নিউ মার্কেটের মতো ফুচকা-চটপটি, নীলক্ষেতের তেহারি, মোসতাকিমের চাপের বিকল্প? আমি যেকোনো দেশে গেলে ওই দেশের খাবার খেয়ে দেখি। ইতালিয়ান, মেক্সিকান— এদের খাবার পৃথিবী বিখ্যাত। কিন্তু আমাদের ঢাকার রাস্তার পাশের যেকোনো খাবারই আজও আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।
মাঝেমধ্যে কোন গানটা শুনে নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে জানেন? আর্কের আশিকুজ্জামান টুলুর গাওয়া ‘এই দূর পরবাসে তারা গুনে আকাশে’ গানটা। ‘মনে পড়ে যায় বন্ধুদের আড্ডা মুখর প্রহর তুমুল উল্লাসে ভরা প্রিয় শহর’— হ্যাঁ, বন্ধুদের আড্ডাকে প্রচণ্ড মিস করি।
আমি যখন প্রতিবার দেশে যাওয়ার সময়ে উড়োজাহাজ থেকে ঢাকাকে দেখতে পাই, আমার মনে হয় এই যে শহরটা, যেখানে সবাই আমার ভাষায় কথা বলে, এ শহরটাকে আমি চিনি। আবার ফেরত চলে আসার সময় শহরটাকে ছেড়ে আসতে বুকটা চিরে যায়।
ঢাকা আমার আবেগের একটি অংশ। হাজার মাইল দূরে থেকেও মন মাঝেমধ্যে সেই প্রিয় শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। আর মনে হয়, কিছু জায়গা কখনো ছেড়ে আসা যায় না; তারা আজীবন হৃদয়ের ভেতর থেকে যায়। ঢাকাও আমার কাছে তেমন।
লেখক: বর্তমানে ডেনমার্কে বসবাসরত এই বাংলাদেশি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার ২৬টি দেশ ভ্রমণ করেছেন




