গল্পে ধাঁধা
আসল নকল

আঁকা : অনন্যা বিশ্বাস
‘আগে কখনো এখানে এসেছিস, পলতে?’ হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল ঋষিদা।
আমার ভালো নাম পল্টু। ঋষিদা আদর করে পলতে বলে ডাকে।
‘না দাদা, আসিনি।’ কাচুমাচু করে বললাম।
‘বলিস কী! তোর জন্ম ঢাকায়। এক যুগের বেশি সময় ধরে আছিস ঢাকাতেই। তবু আহসানউল্লাহ মঞ্জিল দেখিসনি!’
ঋষিদা বিস্ময় প্রকাশ করল।
‘কী করে আসব বলো! সারা দিন স্কুল আর প্রাইভেট নিয়েই থাকি। ঢাকা শহরে সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। কে কাকে নিয়ে বেড়াতে যায়, তুমিই বলো।’
‘হুম!’ ঋষিদা শুধু এটুকুই বলল।
আমি অবশ্য থামলাম না।
‘তোমার মতো গোয়েন্দার সঙ্গে আছি বলেই না দেশের বিভিন্ন জেলার দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখতে পারছি।’
ঋষিদা হাসল।
‘এবার বল আহসান মঞ্জিল সম্পর্কে কী কী জানিস?’
ভাগ্যিস, এখানে আসার আগে গুগল মামা, উইকি চাচাকে ঘেঁটে এসেছি। জানতাম, আমার জ্ঞানের পরীক্ষা নেবে। সুযোগ পাওয়ামাত্র সব উগরে দিলাম।
‘এটি ছিল পুরান ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ আর জমিদারির সদর কাচারি। এর প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আব্দুল গনি। তিনি তার পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামে এর নামকরণ করেন। নির্মাণ শুরু হয় ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে।’
‘আর শেষ হয় কবে?’ ঋষিদা হেসে জানতে চাইল।
‘ভুলে গেছি।’ মাথা চুলকে বললাম।
‘১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে।’ হেসে জবাব দিল গোয়েন্দা।
মাত্র বছর দুয়েক হলো লেখাপড়ার পাশাপাশি ঋষিদার সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করছি। সেই সুবাদে ঘুরেছি দেশের নানান প্রান্তে। ইন্ডিয়াতেও গিয়েছি। একবার কোচবিহারে গিয়ে ওখানকার জমিদারবাড়ি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম।
‘কী সুন্দর! এত সুন্দর জমিদারবাড়ি আমাদের দেশে নেই কেন?’ আফসোসের সুরে বলেছিলাম।
‘কে বলল নেই! তুই কি আহসান মঞ্জিল দেখিসনি?’ ঋষিদা বলেছিল।
‘না তো। কোথায় ওটা?’
‘বুড়িগঙ্গার তীরে। পুরান ঢাকায়। ঢাকায় ফিরে তোকে একদিন আহসান মঞ্জিল দেখাতে নিয়ে যাব।’ ঋষিদা কথা দিয়েছিল।
তারই ফলে আজকের এই ভ্রমণ।
‘এক্সকিউজ মি.। আপনি নিশ্চয়ই ঋষিদা— ফেমাস ডিটেকটিভ!’
পেছনে তাকিয়ে দেখি মোটাসোটা একজন লোক এগিয়ে আসছে।
পরনে কোট-টাই। হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল লোকটি।
‘তখন থেকে আপনাকে দেখছি। চেনা চেনা লাগছিল। তারপরই বুঝলাম, আপনি সেই ফেমাস গোয়েন্দা চিন্ময় রাজর্ষি ওরফে ঋষিদা। ঠিক ধরেছি না?’ বলতে বলতে লোকটা ঋষিদা আর আমাকে নিয়ে নিজের মোবাইলে সেলফি তুলল।
মাথা ঝাঁকাল ঋষিদা।
‘আপনার পরিচয়?’
‘আমার নাম পলাশ মজুমদার। ধানমন্ডি এগারোতে থাকি। আজ সপরিবারে এখানে বেড়াতে এসেছি।’ লোকটি আঙুল দিয়ে ইশারা করে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যদের দেখাল।
‘কী করেন আপনি?’ ঋষিদা হেসে জানতে চাইল।
‘আমি লিফটের ব্যবসা করি। নরসিংদীতে আমার লিফট তৈরির কারখানা আছে।’
‘দারুণ তো! আমি তো ভাবতাম, দেশের বেশিরভাগ লিফটই বাইরে থেকে আসে।’
‘এখন দেশেই প্রোডাকশন হচ্ছে। আসুন না একদিন আমার কারখানা দেখতে।’ নিজের একটা ভিজিটিং কার্ড ঋষিদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন পলাশ মজুমদার।
‘রেখে দে। তুই বড় হয়ে যখন নিজের জন্য প্রাসাদ বানাবি, তখন লিফট লাগানোর জন্য কার্ডটা কাজে লাগবে।’
আমিও মুচকি হেসে কার্ডটা পকেটে রেখে দিলাম।
তখন কী আর জানতাম, খুব শিগগির কার্ডটা আবার ফেরত চাইবে ঋষিদা।
দুই
‘হীরাটার ওজন কত?’ ডায়মন্ডটা ফেরত দিতে দিতে বলল ঋষিদা।
আজ সকালেই ফোন করেছিলেন পলাশ মজুমদার। বিকালে চা খাওয়ার নিমন্ত্রণ দিলেন।
‘হঠাৎ চায়ের নিমন্ত্রণ! কোনো প্রয়োজন?’ ঋষিদা জানতে চেয়েছিল।
‘ছোট্ট একটা প্রয়োজন আছে। ফোনে বলতে চাইছি না। আপনারা দুজনে আসুন। তারপর আলাপ করব।’
বিকালে আমাদের আনার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন পলাশ বাবু।
সেই গাড়িতে চড়ে ধানমন্ডি এগারোতে ‘সপ্তডিঙা’ নামে অ্যাপার্টমেন্টে এসেছি। দশম তলায় বিশাল ফ্ল্যাটে ঢুকতেই মন জুড়িয়ে গেল। অসাধারণ ইন্টেরিয়র। অনেক বড় স্পেস। বাসায় থাকেন শুধু পলাশ বাবু আর তার স্ত্রী।
ছেলেমেয়ে দুজনেই কানাডায় পড়ে।
মিসেস মজুমদার নাস্তার ব্যবস্থা করতে কিচেনে ঢুকে যেতেই পলাশ বাবু ঋষিদার দিকে ঝুঁকে এলেন।
‘একটা বিষয় আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে চাইছি। এটা দেখুন।’ পকেট থেকে একটা বাক্স বের করে দিলেন তিনি।
‘কী এটা?’
‘এটা একটা ডায়মন্ড। আমার মিসেস তার শ্বশুরবাড়ি থেকে উপহার পেয়েছিল।’
ঋষিদা ডায়মন্ডটি হাতের তালুতে নিল। মুহূর্তে ঝিকমিক করতে লাগল রত্নটি।
‘সমস্যাটা কী?’ ডায়মন্ড ফেরত দিতে দিতে বলল ঋষিদা।
‘রতন নামের আমার এক ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু হীরকখণ্ডটি ধার নিয়েছিল দুদিনের জন্য। ওর মেয়ের জন্য হুবহু এরকমই একটা ডায়মন্ড কিনতে চায়। দুদিন পরই ফেরত দিয়েছে। কিন্তু...।’ পলাশ মজুমদার ইতস্তত করলেন।
‘কিন্তু কী?’
‘দেওয়ার সময় আমি এর ওজন পরিমাপ করি। সেটি ছিল ৮.১৭ গ্রাম। দুদিন পর রতন যখন ডায়মন্ডটি ফেরত দিল, তখন দেখি এর ওজন ৮.০৯ গ্রাম। এটা কেমন করে সম্ভব? রতন কি আমার ডায়মন্ডটা বদলে দিয়েছে? সত্যি কি এটা আমার ডায়মন্ড, নাকি অন্য আরেকটা— যেটি সে কিনেছে।’ একনাগাড়ে বলার পর থামলেন পলাশ মজুমদার।
‘আমি কি ডায়মন্ডটা আরেকবার দেখতে পারি’— ঋষিদা বলল।
পলাশ বাবু আবার হীরকখণ্ডটি ঋষিদার হাতে দিলেন।
আপনার কাছে এই ডায়মন্ডটার আগের তোলা কোনো ছবি আছে?
‘আছে।’ পকেট থেকে মোবাইল বের করলেন পলাশ বাবু।
ঋষিদা পকেট থেকে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস বের করল। মোবাইলে তোলা ছবি আর হাতের তালুতে থাকা ডায়মন্ডটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
‘কালার বা সাইজ সবই হুবহু একই আছে। শুধু ওজনটাই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।’ বিড়বিড় করে বলল ঋষিদা।
আমিও ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা নিয়ে ছবি আর হীরকখণ্ডটি খুঁটিয়ে দেখলাম। কোনো পার্থক্য খুঁজে পেলাম না।
‘আপনি কি আপনার বন্ধুর কাছে এ বিষয়ে কিছু জানতে চেয়েছেন?’
‘না। বললাম না, সে আমার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু। তাকে প্রচণ্ড বিশ্বাস করি বলেই নিশ্চিন্তমনে ডায়মন্ডটি দিয়েছিলাম।’
ঋষিদা কিছুক্ষণ ভাবল।
‘আপনি যে যন্ত্রে ডায়মন্ডের ওজন মেপেছেন, সেটি কি একবার দেখতে পারি।’
‘শিওর।’ উঠে গিয়ে ওজন যন্ত্রটা নিয়ে এলেন পলাশ বাবু।
ডিজিটাল ওজন যন্ত্র। ঋষিদা হীরাটির ওজন নিল। পলাশ বাবুর কথা ঠিক।
৮.০৯ গ্রাম।
ডায়মন্ডটা পলাশ মজুমদারের হাতে দিয়ে পকেট থেকে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা আবার বের করল ঋষিদা।
ওজন যন্ত্রের পেছনের লেখাগুলো ভালো করে পড়ল।
তারপর মোবাইল বের করে বেশ কিছুক্ষণ টেপাটেপি করল।
‘এটা আপনারই ডায়মন্ড, কোনো সন্দেহ নেই।’ গম্ভীর গলায় বলল ঋষিদা।
‘কীভাবে?’ বিভ্রান্ত দেখাল পলাশ মজুমদারকে।
পাঠক আপনি উদ্ধার করতে পারবেন রহস্যটা?
উত্তর পাঠাতে হবে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে। সঠিক উত্তরদাতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে একজন পাবেন ১০০০ টাকার বই।




