সমীরণ চৌধুরীর বাক্স রহস্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরমের দুপুর গড়িয়ে তখন পড়ন্ত বিকাল। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার থেকে একটু ভেতরে রাখাল চন্দ্র বসাক লেনের এক পুরনো দালানের সামনে বেশ জটলা পেকেছে। চার ভাইবোন— অত্রি, উজ্জয়িনী, সিন্ধু আর সবার ছোট অর্ণ— ওদের সোনা মাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিল এই ঐতিহাসিক অলিগলিতে। ক্লাস সিক্স থেকে টেনে পড়া এই চার কিশোর-কিশোরী ফুচকা, বাকরখানি ও নানা রকম স্ট্রিটফুড পেট পুরে খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এই ভিড়ের সামনে এসে থামল। কী হয়েছে জানতে চাইলে ভিড়ের ভেতর থেকে একজন জানাল, বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সমীরণ চৌধুরীর সংগ্রহের অমূল্য কিছু পুরনো জিনিস চুরি গেছে। চাকচিক্যহীন সেই জটলার ভিড়ে দাঁড়িয়ে অত্রি ফিসফিস করে বলল, ব্যাপার কী রে! শাঁখারীবাজারে এসে এমন একটা ক্লাসিক মিস্ট্রি কেসের সামনে পড়ে যাব ভাবিনি!
সৌভাগ্যক্রমে, সমীরণ চৌধুরী ওদের সোনা মায়ের পরিচিত। তার পিছু পিছু চার ভাইবোন দোতলায় উঠে এলো। দরজা খুলে ওদের ভেতরে নিয়ে এলেন প্রবীণ চিত্রশিল্পী সমীরণ চৌধুরী। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে তিনি পাশের ঘরের দিকে হাত ইশারায় দেখালেন। ওরা দেখল, মেঝেতে উপুড় করা একটা মেহগনি কাঠের ভারী সিন্দুকসদৃশ পুরনো বাক্স। ভেতরের গোপন পাটাতনটা বলপূর্বক ভাঙা। তার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শতবর্ষী কিছু হলদে হয়ে যাওয়া খাম, ব্রিটিশ আমলের কাগজপত্র আর কয়েক টুকরো কাঁচি দিয়ে কাটা পুরনো ছবি। সমীরণ চৌধুরী মাথা চাপড়ে বারবার বলছিলেন, ওই মেহগনি বাক্স থেকে ব্রিটিশ আমলের একটা দুর্লভ মানচিত্র আর দুটো ছবি উধাও হয়ে গেছে। এগুলোর অ্যান্টিক মূল্য অনেক!
এটা কোনো সাদামাটা চুরি নয়, উজ্জয়িনী গম্ভীর গলায় বলল। সায় দিয়ে অত্রি জবাব দিল, ঠিক বলেছিস। খেয়াল করে দেখ, মেহগনি বাক্সের লকটা ভাঙতে পেশাদার হাতুড়ি বা ছেনি ব্যবহার করা হয়েছে, কোনো চোর তাড়াহুড়ো করে এটা করতে পারে না। যার কাজ, সে বেশ ঠান্ডা মাথায় সময় নিয়ে করেছে। সিন্ধু পকেট থেকে তার ছোট নোটবুক বের করে টুকে নিল, আমাদের এই কেসটা হাতেনাতে ধরে অল্প সময়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। ফেলুদার মতো ঠান্ডা মাথায় মাঠে নেমে ধাপে ধাপে সব সূত্র মেলাতে হবে।
ঠিক আছে। রহস্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানে রোজ আসব। আর এই দাদুর কাছ থেকেও সময় চেয়ে নিই, আহ্লাদে চোখমুখ গোল করে সোনা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল অর্ণ। ও সোনা মা, তুমি আমাদের নিয়ে আসবে তো? আমরা এই রহস্য সমাধান করতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে বাকি ভাইবোনেরাও এই সুর ধরল, বলো না সোনা মা, নিয়ে আসবে তো? চারজনে মিলে নিখুঁত জালের মতো রহস্যটা ভেদ করব। কোমর বেঁধে বলে উঠল চার ভাইবোন। তখন কী আর করে ওদের সোনা মা। অগত্যা রাজি হয়ে গেলেন তিনি।
ওরা খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে মিশনে নেমে পড়ল। চার ভাইবোন ছদ্মবেশে বিভিন্ন অসিলায় রাখাল চন্দ্র বসাক লেন চষে ফেলতে লাগল।
প্রথম দিনে সোনা মাকে গাড়িতে রেখে অত্রি গিয়ে বসে রইল দালানের ঠিক নিচতলার চায়ের দোকানে। সে কৌশলে বুড়ো দোকানদার নবি মিয়ার কাছ থেকে জেনে নিল গত রাতে বা দুপুরের দিকে এই বাড়িতে কাদের আনাগোনা ছিল। নবি মিয়া চা দিতে দিতে ফিসফিস করে জানাল, সেদিন দুপুরে দোতলার চিত্রশিল্পী সমীরণ বাবুর মেহগনি কাঠের বাক্স মেরামতের কথা বলে এসেছিলেন এলাকার প্রাচীন দলিল লেখক ও ফ্রেম মিস্ত্রি ক্ষীতিবাবু। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পর একটা ভিখারি গোছের লোককে সন্দেহজনকভাবে এদিক-ওদিক উঁকিঝুঁকি মারতে দেখা গেছে। এই ভিখারিটি গত কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন নিয়ম করে সমীরণ বাবুর ঘরের বারান্দার ঠিক নিচে এসে দাঁড়িয়ে থাকত এবং সুযোগ পেলেই ওপরের দিকে এমনভাবে তাকাত যেন ভেতরের কার কী মূল্যবান জিনিস আছে তার খবর নেওয়াই তার কাজ। শুধু তা-ই নয়, সে সেদিন দুপুরে দোতলার সিঁড়িতে ওঠার সময় পকেট থেকে একটা চাবির রিং বের করে নাড়াচাড়া করছিল, যা একজন সাধারণ ভিক্ষুকের কাছে থাকার কথা নয়। নবি মিয়া আরও জানাল, ভিখারিটি চলে যাওয়ার ঠিক পরেই দালানে একবার ঢুকেছিল এলাকার কুখ্যাত চোর পিকলু। পিকলু আসার সময় খুব সন্তর্পণে চারপাশ দেখছিল এবং তার ঢোলা পাঞ্জাবির পকেটটা কেমন যেন ভারী ও ফুলে ছিল। সে দোতলার সিঁড়ির কোণ পর্যন্ত উঠেছিল এবং ফেরার সময় তার মুখে ছিল এক চিলতে রহস্যময় হাসি। তার এই সন্দেহজনক আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল সে হয়তো ভেতরে ঢোকার কোনো সুযোগ খুঁজছিল কিংবা হাতবদল করার মতো সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।
দ্বিতীয় দিনে উজ্জয়িনী, সিন্ধু আর অর্ণ সোজা চলে গেল বাড়ির পেছনের দিকের পুরনো গুদামঘরটায়, যেখান দিয়ে দোতলায় ওঠার একটা সরু কাঠের সিঁড়ি আছে। সেখানে গিয়ে ওরা খেয়াল করল, সিঁড়ির ধাপে বেশ কিছু তাজা বেগুনি রঙের সিনথেটিক বার্নিশের ফোঁটা পড়ে আছে, যা সাধারণ পুরান ঢাকার বাড়িতে সচরাচর দেখা যায় না। এই বিশেষ রঙের বার্নিশ শুধু পুরনো আমলের ছবির ফ্রেম বা কাঠের কারুকার্যে ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া, গুদামঘরের ঠিক কোণটায় একটা বিশেষ ধরনের কাঠ কাটার ছোট সোনা-রঙা হাতুড়ি ও ছেনির অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকতে দেখা গেল।
তৃতীয় দিন বিকালে সমীরণ বাবুর সেই বারান্দার নিচেই আবার এসে দাঁড়াল চার ভাইবোন। অত্রি চারজনকে চারটা ভাগে কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল। সিন্ধু গেল ক্ষীতিবাবুর দোকানের সামনে নজর রাখতে, অর্ণ খোঁজ নিল ওই বেগুনি রঙের বার্নিশ কোথায় বিক্রি হয় আর উজ্জয়িনী মেহগনি বাক্সের ভাঙা কাঠের টুকরোগুলো এবং গুদামঘরের ছেনির ছাপ পরীক্ষা করে দেখল।
সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে চারজন মিলে দোতলার বারান্দায় হাজির হলো সমীরণ বাবুর সামনে। কী রে দাদুভাইরা, কিছু বুঝলি? পুলিশ তো কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছে না, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সমীরণ বাবু। সামনে এগিয়ে এলো অত্রি। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। সে পকেট থেকে বের করল বেগুনি রঙের বার্নিশে মাখা একটা পুরনো কাঠের টুকরো আর এক টুকরো লাল সুতো। দাদু, আপনার এই বাক্সটা কোনো ছিঁচকে চোর বা বাইরে থেকে আসা কেউ চুরি করেনি। এটা ঘরের ভেতরেই কেউ সুকৌশলে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে, যাতে অন্য কাউকে ফাঁসানো যায়, আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল অত্রি। গত দুদিন আমরা হরিশচন্দ্র লেন এবং রাখাল চন্দ্র বসাক লেনের প্রতিটি কোনায় গোয়েন্দাগিরি করে বুঝেছি, এই কাজটার পেছনে এমন একজন আছে, যে আপনার স্টুডিওর প্রতি ইঞ্চি জায়গা চেনে এবং নিখুঁত জানাশোনা রাখে।
পাঠক বলুন তো চুরিটা কে করেছে? খুদে গোয়েন্দারা কীভাবে তা বুঝল।






