মাছ চাষে নতুন দিশা

পরপর চারবার এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান। নিজের টাকায় তিনি গড়েছেন গবেষণাগার। তার গবেষণা জীবন নিয়ে লিখেছেন ও ছবি তুলেছেন আমান উল্লাহ
গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকলে থমকে যেত তার স্বপ্ন। তাই গবেষণা কাজ চালিয়ে যেতে নিজের সঞ্চয়ের সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ‘ল্যাবরেটরি অব ফিশ ইকোফিজিওলজি’ গড়ে তুলেছেন ড. মো. শাহজাহান। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক।
২০০৪ সালে বাকৃবিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০১৪ সালে অধ্যাপক হন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে জাপানে পিএইচডি করেন। দেশে ফিরে ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের দক্ষিণ পাশে ছোট একটি টিনশেড স্থাপনায় গবেষণাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ধীরে ধীরে পুকুর ও পরীক্ষামূলক মাছ চাষের ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে লবণাক্ততা। একই সঙ্গে পানি ও মাটিতে দূষণের প্রভাবও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। মাছের শরীরে ভারী ধাতু, কীটনাশক ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের। আড়িয়ল বিল, চলন বিল, বিভিন্ন হাওর, ব্রহ্মপুত্র নদ এবং কক্সবাজার ও কুয়াকাটার উপকূলীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন জলাশয় থেকে মাছ, পানি ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা করছেন ড. শাহজাহান। দূষণের উপস্থিতি শনাক্ত করাই তার কাজের শেষ নয়। পরিবেশের পরিবর্তনের মধ্যেও কীভাবে মাছের উৎপাদন ধরে রাখা যায়, সেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছেন তিনি। এ কারণে তার গবেষণায় গুরুত্ব পাচ্ছে জলবায়ু-সহনশীল মৎস্য চাষ। এই কার্যক্রমের একটি উদাহরণ উপকূলীয় অঞ্চলে খাঁচায় ভেটকি মাছ চাষ। প্রচলিত পুকুর বা ঘেরের বাইরে নদী ও উপকূলীয় খালের পানিতে খাঁচা স্থাপন করে মাছ চাষের এ পদ্ধতি নিয়ে মহেশখালী, ভোলা ও সাতক্ষীরায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তবে সব এলাকায় সমান সাফল্য আসেনি। ভোলায় খাঁচা চুরি ও স্থানীয় নানা প্রতিবন্ধকতায় গবেষণা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আবার মহেশখালী ও সাতক্ষীরায় এভাবে মাছ চাষে সম্ভাবনা দেখা গেছে। এখন সাতক্ষীরায় স্থানীয়ভাবে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ চলছে।
ড. শাহজাহান জানালেন, খাঁচায় ভেটকি চাষ পদ্ধতিতে প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও দীর্ঘ মেয়াদে লাভের সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি খাঁচা নির্মাণে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা খরচ হয়। তবে একেকটি খাঁচা প্রায় ১০ বছর ব্যবহার করা সম্ভব। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে গড়ে এক টাকা ৭০ পয়সা পর্যন্ত আয় হতে পারে। ফলে উপকূলীয় এলাকায় বিকল্প মৎস্য চাষের পদ্ধতি হিসেবে খাঁচায় ভেটকি চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।
মাছ চাষে খাবারের পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি খরচ হয়। তাই কম খাবারে মাছের বেশি বৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো ড. শাহজাহানের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রোবায়োটিকের কার্যকারিতা যাচাইয়ে। রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন মৎস্যচাষকেন্দ্রে প্রোবায়োটিকের গুণগত মান ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। আমদানি নির্ভর এসব উপাদানের মান যাচাইয়ের পাশাপাশি এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুপারিশও দিয়েছেন।
রুই মাছের পোনা লালনে প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার ব্যবহার করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন তিনি। পরীক্ষায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি মাত্রায় প্রোবায়োটিক প্রয়োগ করা দলে রুই মাছের চূড়ান্ত ওজন হয়েছে ৯ দশমিক ৫২২ গ্রাম; যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় ওজন ছিল ২ দশমিক ৬৪৮ গ্রাম। একই পরীক্ষায় মাছের বেঁচে থাকার হার ৬২ থেকে বেড়ে ৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
আরেকটি পরীক্ষায় মাছের খাবারের সঙ্গে বিশেষ ধরনের উপকারী ইস্ট বা ছত্রাক জাতীয় অণুজীব মিশিয়ে ৬০ দিন খাওয়ানো হয়। এতে রুই ও তেলাপিয়া মাছের বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। গবেষকের মতে, উপকারী অণুজীবের যথাযথ ব্যবহার মাছের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি খাবারের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ড. শাহজাহানের গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য, বিক্রিয়া ঘটানোর উপাদান ও অর্থায়নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে গবেষণার ফল প্রয়োগ করতে গিয়েও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় তাকে। এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে দেশি-বিদেশি গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে গবেষণা এগিয়ে নিচ্ছেন তিনি। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
দীর্ঘ গবেষণাজীবনে দুই শতাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে এই শিক্ষকের। তার তত্ত্বাবধানে গবেষণা করা দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন ২৫ জনেরও বেশি। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০২৪ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো নির্বাচিত হয়েছেন।
নিজের প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন ড. মো. শাহজাহান। তার লক্ষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে মাছ চাষের কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা এবং সেটি মাঠ পর্যায়ে চাষিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নতুন প্রজন্মের গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘গবেষণা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে হলে তরুণদের নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য গবেষণায় সময় ও শ্রম দিতে হবে।’



