ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের বিশ্বজয়

বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’। ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে (ইউআরসি) তাদের সাফল্যের গল্প লিখেছেন মোফাজ্জল হোসেন
প্রতিযোগিতাটি হয়েছিল গত ২৭ থেকে ৩০ মে। বিশ্বের ১৮টি দেশের ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১১৬টি দল অংশগ্রহণ করেছে এতে। দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত হয়েছে ৩৮টি দল। ৩৫টি দলকে পেছনে ফেলে ৪০০ দশমিক ৪৪ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বে তৃতীয় স্থান এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’। ৪৬৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট পেয়ে প্রথম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলোজির মার্স রোভার ডিজাইন টিম। ৪১২ দশমিক ৪১ পয়েন্ট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির মোনাশ নোভা রিভার টিম। তাদের সবাইকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে বসেছিল ‘ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতার আসর।
এবারের তৃতীয় ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো ‘ইউআরসি’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। এ বছর প্রতিযোগিতার শেষ দিনে বিশ্বের এই শীর্ষ দলটির আবিষ্কার করা রোভার দেখে সবাই অনুপ্রাণিত হয়েছে। এবারের দলটির প্রধান সাইফ আল সাদ বলেছেন, ‘বিশ্বে তৃতীয় হওয়াটা অবশ্যই আনন্দের, অন্য দলগুলো আমাদের সিস্টেম দেখতে আসে, প্রযুক্তিগত আলোচনা করে। এটি প্রমাণ করে, ধারাবাহিক পরিশ্রম, সঠিক পরিকল্পনা এবং একটি শক্তিশালী টিম কালচার থাকলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও বিশ্বসেরাদের মধ্যে আসতে পারে।’
ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ২০২২-২৬ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচবার এশিয়ায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ইউআরসি ২০২৪-এ দলটি বিশ্বে পঞ্চম স্থান ও ইউআরসি ২০২৫-এ বিশ্বে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে এবং বেস্ট সায়েন্স অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছে। গত বছর দলটি তুরস্কের আঙ্কারায় আনাতোলিয়াল রোভার চ্যালেঞ্জে বিশ্বে ‘তৃতীয় স্থান’ অর্জন করে ও ‘বেস্ট সায়েন্স সিস্টেম অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। পাশাপাশি তাদের ঝুলিতে ছিল ‘বেস্ট অটোনোমাস ড্রাইভ অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম অ্যাওয়ার্ড’।
ইউআইউ মার্স রোভার টিমের এ বছর তৈরি করা রোভারের নাম ‘অরিয়ন’। পুরোপুরি নতুনভাবে তৈরি। এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ দলটির জন্য সহজ ছিল না, তাদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জনবল সংকট। দলের মোট সদস্য সংখ্যা ৩০ জন হলেও ভিসা জটিলতায় প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নেন আট সদস্য। অবশ্য পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও একজন যোগ দেওয়ায় প্রতিযোগিতায় মাঠপর্যায়ে কাজ করে ৯ সদস্যের ক্ষুদ্র দল। ৩০ জনের কাজ ৯ জনকেই সম্পন্ন করতে হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রস্তুত রাখতে, দলটি সাধারণ সময়ের তুলনায় ১০ দিন আগে, অর্থাৎ ১৭ মে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতার আগের দিনগুলোও ছিল তাদের জন্য কঠিন। উটাহর মরুভূমিতে অনুশীলনের সময় ধূলিঝড়, প্রবল বাতাস এবং বৃষ্টির কারণে তাদের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হয়েছে। তবে তা দলটির পরিকল্পনাকে বদলাতে পারেনি, ভাঙতে পারেনি তাদের মনোবল।
প্রতিযোগিতায় দলের প্রধান সাইফ আল সাদ ছাড়াও ছিলেন— মুশফিকুর রহমান, শেখ সাকিব হোসেন, আয়েশা আক্তার সায়মা, সালমান কবির চৌধুরী, সাব্বির আহমেদ, তন্ময়, সিয়াম ইবনে সারওয়ার ও মিমতিয়াজ ইসলাম হিমেল। দলের মেন্টর ছিলেন ইউআইইউর কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রভাষক আবিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘ইউআরসি আমাদের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়। এটি এমন একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী, গবেষক এবং প্রকৌশলীরা নিজেদের কাজ প্রদর্শন করেন, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন এবং একে অন্যের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পান। এখানে কে কত পয়েন্ট পেল, তা ছাড়া কী নতুন প্রযুক্তি তৈরি হলো, কী ধরনের সমস্যার সমাধান হলো এবং ভবিষ্যতের গবেষণার জন্য কী ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হলো— সেগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্জন আমাদের বার্তা দেয়, সঠিক দিকনির্দেশনা, গবেষণা, অধ্যবসায় ও উদ্ভাবনের সুযোগ পেলে বাংলাদেশের তরুণরাও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পারে। সীমিত সম্পদ, সীমিত সুযোগ এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সাফল্যের সঙ্গে সেরা অবস্থান অর্জন করতে পারে, ইউআইইউ মার্স রোভার টিম তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।’




