‘অন্যপাতা’য় স্বপ্নের ঝিলিক

চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে প্রত্যাশা পাল
টিউশনি আর হাতখরচের টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীরাই বানিয়েছেন চলচ্চিত্র ‘অন্যপাতা’। মুক্তি পেয়ে এখন এটি প্রেক্ষাগৃহে চলছে। চলচ্চিত্রটির পেছনের গল্প নিয়ে লিখেছেন সব্যসাচী দীপ্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার ব্যস্ততার মধ্যেই চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী শাহজাহান এ্যানি। সেই স্বপ্নেরই ফল ‘অন্যপাতা’। তিনি বললেন, “কভিডের সময় নিজের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা আমাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। পরে অমিতাভ রেজার পরামর্শে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে পড়াশোনা করলাম। এরপর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অন্যপাতা’র নির্মাণের কাজ শুরু করেছি।” নিজেদের উদ্যোগে প্রযোজনা থেকে শুরু করে পরিবেশনা— সবকিছু সামলাতে গিয়ে প্রতিটি ধাপেই নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের এই দলকে। চলচ্চিত্রটির অর্থের জোগান এসেছে নিজেদের টিউশনির আয়, হাতখরচ থেকে জমানো টাকা ও ব্যাংকঋণ থেকে।
সিনেমাটির অন্যতম প্রযোজক ও সহকারী পরিচালক চুয়েটের শিক্ষার্থী অংকন দে অনিমেষ বললেন, ‘সিনেমার অনেক কিছুই আমরা জানতাম না। কাজের সময় ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল। প্রক্রিয়াটি কেমন, কার কাছে যাব, কী করব— কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তখন প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় লাখ টাকার মতো খুইয়েছি। বাজেট নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলব না, কারণ খরচ এখনো চলছে। শুধু এটুকু বলব, আমাদের পকেটের প্রচুর টাকা চলে গেছে।’
‘অন্যপাতা’য় উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতিকালীন জীবনের গল্প। কোচিংয়ের ব্যাচ, মডেল টেস্টের চাপ, কাঙ্ক্ষিত ক্যাম্পাসে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন— সব মিলিয়ে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর চেনা সময় পর্দায় তুলে ধরেছেন নির্মাতারা। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঘিরে আবর্তিত হয়েছে আর্থিক সংকট, পরিবারের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত ও আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন। এই চলচ্চিত্রে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলা এক তরুণের জীবনের সঙ্গে দর্শক নিজেদের অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পাবেন বলে জানালেন পরিচালক এ্যানি। তিনি আরও জানালেন, চলচ্চিত্রটির বেশিরভাগ শুটিং হয়েছে চট্টগ্রামে। টানা দুই বছর ধরে চলেছে কাজ।
অংকন দে অনিমেষ বললেন, “এই চলচ্চিত্র নিয়ে আমরা শুরু থেকেই আশাবাদী ছিলাম। সবচেয়ে বড় কারণ কমেডির মিষ্টি অভিজ্ঞতা, যা সবসময় দেখা যায় না। আমরা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও গান দিয়ে যে মিউজিক্যাল জার্নি তৈরি করেছি, তা নিয়ে দর্শকের কাছ থেকে বেশ সাড়া পেয়েছি। আরেকটি বিষয় হলো, চলচ্চিত্র মাধ্যমে অ্যাডমিশন লাইফ নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় না। অথচ এই জীবনের মধ্য দিয়ে আমরা সবাই যাই। ‘অন্যপাতা’য় এর মধ্য দিয়ে আমাদের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।”
১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের চলচ্চিত্রটিতে আবেগ, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা জীবন্ত করে তুলতে রাখা হয়েছে ছয়টি মৌলিক গান। ফাহরিয়ান তাসজিম মননের সংগীত পরিচালনা এবং আইনানের আবহসংগীত এখানে তৈরি করেছে আলাদা আবহ। নির্মাতার ভাষ্য, গান ও আবহসংগীত শুধু গল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়নি; দর্শকের আবেগের সঙ্গেও সংযোগ তৈরি করেছে।
চলচ্চিত্রটি নির্মাণে ক্যামেরার সামনে ও পেছনে কাজ করেছেন অনেক তরুণ। চরিত্রগুলোকে ধারণ করা থেকে শুরু করে নির্মাণের নানা ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বড় পর্দায় নিয়ে আসা— পুরোটাই ছিল দলের সদস্যদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা ঘোষ অভিনয় করেছেন প্রধান দুই চরিত্রে। শাকিল বললেন, ‘প্রথমবার সিনেমায় কাজ করছি বলে আমার অনেক উৎসাহ ছিল। এই চলচ্চিত্রের কাহিনি, আমাদের পুরো টিম এবং আমার অভিনীত চরিত্রের জীবনযাত্রা আমাকে অভিনয়ে অনুপ্রাণিত করেছে। একটি চরিত্র দুই বছরের বেশি সময় ধরে বয়ে বেড়ানো আমার কাছে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।’ নায়িকা প্রত্যাশা বললেন, ‘এই চলচ্চিত্রের গল্পই আমাকে কাজ করার জন্য সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছে।’
প্রযোজক ও বুয়েট শিক্ষার্থী সামস আবতাহি ইসমাম বললেন, “আমার জন্য ‘অন্যপাতা’ হলো স্বপ্ন সত্যি করার গল্প। প্রযোজক হিসেবে প্রথম কাজ বলে প্রতিমুহূর্তেই নতুন কিছু শিখেছি, ভুল করেছি; আবার ঠিক করার চেষ্টা চালিয়েছি। এত মানুষের বিশ্বাস আর পরিশ্রমকে একটি গল্পের মধ্যে দেখতে পেরে ভালো লেগেছে।’ সিনেমায় সহনায়ক ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির ছাত্র মোহাম্মদ ইফতিখার শাইম। সিনেমার কালার গ্রেডিং ও পোস্ট প্রোডাকশন পুরোটি একা হাতে সামলেছেন চুয়েটের তানভীর জানি। চিত্রগ্রাহক ছিলেন ইব্রাহিম বিন আনছারী। কাস্টিং পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোমান আহমেদ রনি। কারিগরি ও শিল্প নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দ্র নীল। থ্রিডি অ্যানিমেশন আর্টিস্ট বুয়েটের মাশরাফি ইসলাম শাফিন। লাইন প্রডিউসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একা হাতে সামলেছেন সুদীপ্ত পাল, যিনি সবে এসএসসি পাস করেছেন।এই চলচ্চিত্রের সবাই বুয়েট, চুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই ৪১ শিক্ষার্থীর সম্মিলিত মেধা, শ্রম ও ভালোবাসায় নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘অন্যপাতা’। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার ফাঁকে তাদের স্বপ্নের যাত্রা এখন জায়গা করে নিয়েছে বড় পর্দায়। এবারের দুর্গাপূজায় দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রেক্ষাগৃহে একাধিক প্রদর্শনী হাউজফুল হওয়ার মাধ্যমে পেয়েছে স্বীকৃতি। অংকন দে অনিমেষ বললেন, ‘আমাদের কাছে এখন বেশ কিছু স্ক্রিপ্ট ও আইডিয়া আছে। সেগুলো নিয়ে কাজ করার ইচ্ছাও রয়েছে।’




