মেঘনাপাড়ের শতবর্ষী

খেদমত আলী
ভোরে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়েন। এরপর হাঁটতে হাঁটতে চলে যান খেয়াঘাটের চায়ের দোকানে। সেখানে চা আর বনরুটি খেতে খেতে পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। দুপুরে সামান্য খাবার খেয়ে বিকালে আবার বসেন চায়ের আড্ডায়। সন্ধ্যা নামলে বাড়ির পাশের মসজিদে যান। সেই মসজিদেই কাটে রাত। বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে এসেছে, তবে নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস এখনো ছাড়েননি।
শতবর্ষী এই মানুষটির নাম খেদমত আলী। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মুর্শিদাবাদ গ্রামে মানুষটির নিবাস। জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে দেখেছেন বহু মানুষের জন্ম; বদলে যেতে দেখেছেন চারপাশের জনপদ, মেঘনার গতিপথ আর মানুষের জীবনযাপন। যে নদীপথে একসময় পালতোলা নৌকা ছাড়া যোগাযোগের উপায় ছিল না, সেখানে এখন ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলে। বদলে গেছে গ্রামের অনেক কিছুই।
খেদমত আলীর জন্ম ফকিরের চরে। সে সময় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল দাঁড়টানা ও পালতোলা নৌকা। ছোটবেলায় চরের বালুতে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলতেন, খেলতেন হাডুডু। তবে পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় বেশিদিন নিশ্চিন্তে কৈশোর কাটানোর সুযোগ হয়নি। সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। এইসব গত শতকের শুরুর দিকের কথা।
নদীভাঙন আর জীবিকার তাগিদে প্রায় আট দশক আগে বাবার সঙ্গে চলে আসেন মুর্শিদাবাদ গ্রামে। দিনের বড় অংশই কাটত কৃষিকাজে। সন্ধ্যার পর কখনো গ্রামের উঠোনে বসত জারি বা পালাগানের আসর। গানের প্রতি তার অদ্ভুত টান ছিল।
জীবনের একপর্যায়ে বিয়ে করেন তালবের নেছাকে। একসময় তিনিও গত হলেন। সংসারে এলেন দ্বিতীয় স্ত্রী টুকটুকি বেগম। তার বয়সও এখন ৮০ পেরিয়েছে। দুই সংসারে খেদমত আলীর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই বেঁচে আছেন। নাতি-নাতনির সংখ্যা প্রায় ৪০।
দুই সংসারে খেদমত আলীর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই বেঁচে আছেন। নাতি-নাতনির সংখ্যা প্রায় ৪০
গ্রামের বাড়ির পুরনো জামে মসজিদে চার দশক ধরে আজান দিয়েছেন খেদমত আলী। কণ্ঠ ছিল ভরাট ও সুমধুর। আজান শুনে একসময় মুগ্ধ হয়েছিলেন তৎকালীন থানার ওসি। খেদমত আলীকে ডেকে নিয়ে ৫০০ টাকা পুরস্কারও দিয়েছিলেন তিনি।
এখন বয়সের কারণে নিয়মিত মাইকে আজান দেওয়া হয় না তার। ছেলেদের অনুরোধে একসময় দায়িত্বটি ছেড়ে দিতে হয়েছে। তার মেজো ছেলে মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাবা ছোটবেলা থেকেই খুব কর্মঠ। দাদার সঙ্গে মাঠে গিয়ে কৃষি কাজ করতেন,আমার ছোটবেলায়ও তাকে মাঠেই দেখেছি। তখনই তার বয়স একশর কাছাকাছি।’ স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ই নাকি খেদমত আলী প্রৌঢ়ত্ব স্পর্শ করেছিলেন। এই বয়সেও সহায়তা ছাড়াই নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন। চশমা ছাড়াই আশপাশের জিনিস দেখতে পান বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। হাতে একটি পুরনো লাঠি রাখেন, মূলত ভরসার জন্য। দীর্ঘ জীবনে একবার কলেরায় আক্রান্ত হয়ে সাত দিন ভুগেছিলেন। এ ছাড়া অন্য কোনো বড় অসুখের কথা তার মনে পড়ে না। তার এই সুস্বাস্থ্যের সাক্ষ্য পাওয়া গেল এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী আবুল কালামের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে দেখেছি উনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়ছেন। তখনই বেশ সবল। আর খাবার দাবারের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন।’
দীর্ঘ জীবনের রহস্য জানতে চাইলে খেদমত আলী সহজ জীবনযাপন আর নিয়ম মেনে চলার কথা বলেন। যৌবনে মাঠে কাজ করেছেন, পরিশ্রম করেছেন। আজীবন নিজেদের ক্ষেতের শাকসবজি, নদীর মাছ, দেশি গাভীর দুধ খেয়েছেন। বাবার সঙ্গে বাজার থেকে আনা আখের গুড়ও ছিল পছন্দের খাবার। খেদমত আলীর দীর্ঘায়ুর পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাসসহ নানা বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জীবনের গল্পে নিয়মিত চলাফেরা, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সাদাসিধে খাবার আর পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি ছবি পাওয়া যায়।
মেঘনার চরাঞ্চলে জন্ম নেওয়া খেদমত আলী এখন জীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যখন তার চারপাশের অনেক মানুষই স্মৃতির অংশ হয়ে গেছেন। বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন অনেকেই চলে গেছেন। এখন তার দিন কাটে নামাজ, হাঁটা, চা আর মানুষের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্য দিয়ে।



