জীবনযাপন
ছোট হাতে ঘরের কাজ

মডেল: মাশিয়াত মাশরুরা জুনাইনাহ; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
আজ যে ছোট্ট হাত খেলনা গুছিয়ে রাখছে, কাল সেই হাতই নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে শিখবে। কেননা শিশুদের জন্য স্বনির্ভরতার শিক্ষা শুরু হয় ঘরের ছোটখাটো কাজ থেকেই। লিখেছেন প্রিয়াঞ্জলি রুহি
নিজের বই গুছিয়ে রাখা, খাওয়ার পর প্লেট রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া কিংবা নির্দিষ্ট বাক্সে খেলনা তুলে রাখা— এমন সামান্য কাজের মাধ্যমেই শিশু দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার শিক্ষা পায়; সঙ্গে নিজের কাজ নিজে করার আনন্দও। বয়সে ছোট বলে অনেক অভিভাবকই শিশুকে বাড়ির কাজে যুক্ত করতে চান না। অথচ এসব কাজের অর্থ তাকে গৃহস্থালির বোঝা চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং পরিবারের সদস্য হিসেবে ছোট ছোট দায়িত্বের সঙ্গে পরিচিত করা। এতে সে বুঝতে শেখে— ঘরটি যেমন সবার, ঘরকে সুন্দর রাখার দায়িত্বও প্রত্যেকেরই।
বয়স অনুযায়ী: দুই-তিন বছরের শিশুকে দিয়েই শুরু করা যায়। খেলা শেষে নির্দিষ্ট স্থানে খেলনা রাখা, বই নিচের তাকে রেখে দেওয়া কিংবা ময়লা কাপড় ঝুড়িতে রাখার মতো দায়িত্ব তাকে বোঝানোই যায়। চার-পাঁচ বছর বয়সে নিজের জুতা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা, খাবার টেবিলে চামচ-গ্লাস পৌঁছানো, গাছের টবে পানি দেওয়া কিংবা নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখার মতো কাজ দিতে পারেন। ছয় থেকে আট বছর বয়সে বিছানা ও স্কুলব্যাগ গোছানো, খাবারের পর নিজের প্লেট নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা, সহজ কিছু রান্নার প্রস্তুতিতে বড়দের পাশে থাকা কিংবা ঘরের হালকা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার অভ্যাস করানো যেতে পারে। শিশুটি আরও বড় হলে তাকে নিজের কাপড় ভাঁজ করে রাখা, ঘর ঝাড়ু দেওয়ার মতো সহজ এবং বাজারের তালিকা তৈরি করতে সাহায্য করা কিংবা রান্নাঘরের নিরাপদ কিছু কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
আগে দেখান, পরে করতে দিন: শিশুকে কোনো কাজের নির্দেশ দিয়ে দূরে সরে যাওয়া ঠিক নয়। কাজটি কীভাবে করা দরকার, তা প্রথমে দেখিয়ে দিয়ে এরপর তাকে করতে দিন। ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে কাজটি কেড়ে নেবেন না। ধরা যাক, সে বইগুলো ঠিকমতো সাজাতে পারছে না; এমন পরিস্থিতিতে ‘তুমি কিছুই পারো না’ বলার বদলে বলুন, ‘চলো, বইগুলো বড় থেকে ছোট করে সাজাই।’
‘তুমি নিজের বইগুলো নিজে গুছিয়েছ, খুব ভালো হয়েছে’— এমন স্বীকৃতি শিশুকে পরেরবারও কাজটি করতে উৎসাহিত করবে
নিখুঁত নয়, অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ: শিশু বিছানা গুছিয়েছে, কিন্তু চাদর কুঁচকে আছে। কাপড় ভাঁজ করেছে, কিন্তু তা সমান হয়নি। প্লেট সরিয়েছে, কিন্তু জায়গাটা একটু এলোমেলো হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে কাজটি আবার নিজের হাতে করে ফেলার প্রবণতা অনেক বাবা-মায়েরই থাকে। এতে কাজ হয়তো নিখুঁত হবে, তবে শিশুর মনে তৈরি হতে পারে আত্মবিশ্বাসের অভাব। তাই প্রথমদিকে তার কাজে কিছুটা অগোছালো ভাব মেনে নেওয়াই ভালো। ধীরে ধীরে সে নিজেই শিখবে কীভাবে আরও ভালো করা যায়।
‘আমার কাজ’ বলে কিছু থাক: শিশুর জন্য প্রতিদিনের কয়েকটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব ঠিক করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন— নিজের বিছানা ও স্কুলব্যাগ গোছানো, খেলনা সরিয়ে রাখা। একসঙ্গে অনেক কাজের বদলে কয়েকটি সহজ দায়িত্ব দিয়ে শুরু করুন। কাজগুলো নিয়মিত হলে তার কাছে এগুলো আর আলাদা কোনো ‘কাজ’ মনে হবে না; বরং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হবে।
ছেলে-মেয়ে আলাদা নয়: ‘এটা মেয়েদের কাজ’ কিংবা ‘ছেলেরা এসব করে না’— এ ধরনের ধারণা শিশুর মনে কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরি করে। ভবিষ্যৎ জীবনে নিজের যত্ন নেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে দায়িত্ব ভাগাভাগি করার শিক্ষা সব শিশুরই প্রয়োজন।
পুরস্কার নয়, প্রশংসা: প্রতিটি কাজের বিনিময়ে টাকা, চকলেট কিংবা খেলনা দেওয়ার অভ্যাস করা ঠিক নয়। এতে দায়িত্ববোধের জায়গায় পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। বরং কাজটি করার পর তার চেষ্টা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করুন। ‘তুমি নিজের বইগুলো নিজে গুছিয়েছ, খুব ভালো হয়েছে’— এমন স্বীকৃতি শিশুকে পরেরবারও কাজটি করতে উৎসাহিত করবে। তবে বিশেষ কোনো অতিরিক্ত কাজের জন্য বয়স উপযোগী পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। মূল বিষয় হলো, প্রতিদিনের নিজের দায়িত্ব যেন পুরস্কারের ওপর নির্ভরশীল না হয়।
পরিবারের কাজ সবার: শিশুকে বাড়ির কাজে অভ্যস্ত করতে কার্যকর উপায় হলো বড়দের আচরণ। বাবা নিজের কাপড় গুছিয়ে রাখছেন, মা খাবারের পর টেবিল পরিষ্কার করছেন, পরিবারের অন্য সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন— এসব দেখেই শিশু শেখে। তাই তাকে ‘কাজ করো’ বলার পাশাপাশি নিজেদেরও কাজের সংস্কৃতি তৈরি করুন। সপ্তাহে এক দিন সবাই মিলে ঘর গোছানোর ছোট্ট আয়োজন করতে পারেন। এটি দায়িত্বের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দের সময়ও হয়ে উঠবে।
নিরাপত্তা আগে: শিশুকে কাজ শেখানোর সময় নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ছুরি-কাঁচি, গরম চুলা, বৈদ্যুতিক যন্ত্র, শক্তিশালী পরিষ্কারক রাসায়নিক বা ভারী জিনিসপত্র থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ কাজের পরিধি বাড়ানো যেতে পারে; তবে নতুন কিছু শেখানোর সময় বড়দের নজর থাকা জরুরি।
বকা নয়, ভরসা: শিশু কাজ করতে গিয়ে পানি ফেলে দিতে, কিছু ভেঙে ফেলতে কিংবা কোনো ভুল করতে পারে। তখন রাগ না করে ভুলটি সামলানোর পদ্ধতি শেখানো দরকার। কারণ ঘরের কাজ শেখানোর আসল উদ্দেশ্য ঘর ঝকঝকে রাখা নয়; বরং শিশুকে এমনভাবে বড় করা, যাতে একদিন সে নিজের এবং চারপাশের মানুষের দায়িত্ব নিতে পারে।



