মনের খেয়াল
সবাই করছে আমিও করব

মডেল: মাহাদিয়া ইসলাম; সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ফিয়ার অব মিসিং আউট। সময়ের সঙ্গ থেকে ছিটকে পড়ার এক অজানা ভয়। হুজুগে গা ভাসিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই অন্ধ অনুকরণের এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায় জানাচ্ছেন নাহিদ ইসলাম
হঠাৎ করেই হয়তো ফেসবুকে নির্দিষ্ট কোনো পাহাড়ে ঘোরার কিংবা বিশেষ রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ছবি ও ভিডিও পোস্টের হিড়িক পড়ে গেছে। নিজের ওই পাহাড়ে যাওয়ার শারীরিক সক্ষমতা কিংবা ওই রেস্তোরাঁর খাবার পছন্দের তালিকাতে নেই; তবুও অবচেতন মন বলতে থাকে, ‘সবাই তো করছে, আমাকেও করতে হবে।’ নাগরিক জীবনের এ এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন। অন্যের জীবনের পাতা উল্টে নিজের গল্প লিখতে যাওয়ার এ তাড়না আমাদের ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে বিপর্যয়ের দিকে।
এ মনস্তাত্ত্বিক সংকট সম্পর্কে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত শারমিন বললেন, ‘মানুষ স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকার যে আদিম তাড়না, সেখান থেকেই জন্ম নেয় অন্যের মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা। কোনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা থেকেই মানুষ নিজেকে স্রোতের সঙ্গে ভাসিয়ে দেয়। মনে হয়, সবাই যা করছে, তাতে শামিল হতে না পারলে হয়তো সমাজ বা দল থেকে ছিটকে পড়তে হবে।’ তার মতে, এ নিরাপত্তাহীনতার আগুনে প্রতিনিয়ত ঘি ঢালছে সোশ্যাল মিডিয়া। তিনি বললেন, “অন্যের জীবনের শুধু ঝকমকে দিকটাই আমরা স্ক্রিনে দেখি। ফলে অবচেতনভাবেই ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ (‘ফোমো’) আমাদের গ্রাস করে। মনে হতে থাকে, ‘সবাই খুব ভালো আছে, জীবনের দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমিই বড্ড পিছিয়ে পড়লাম।’ এ অবাস্তব তুলনার কারণে আমাদের ভেতরে জন্ম নেয় অস্থিরতা, হতাশা, হীনম্মন্যতা আর নিজের প্রাপ্তিগুলো নিয়ে চরম অসন্তুষ্টি।”
দিনশেষে নিজের জন্য কোনটি সত্যিকার অর্থে ভালো, সেই হিসাব নিজেকেই কষতে হবে
অন্ধ অনুকরণের এ পথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় মানুষ নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলে। নুসরাত শারমিন সতর্ক করে জানালেন, দীর্ঘদিন অন্যের দেখানো পথে হাঁটলে নিজের কী ভালো লাগে বা আসলেই কী প্রয়োজন, তা বোঝার ক্ষমতা ভোঁতা হয়ে যায়। অন্যের পছন্দকে নিজের বলে মেনে নেওয়ার এ চর্চা দীর্ঘস্থায়ী হলে একসময় মানুষ তার নিজস্ব বিচার-বিবেচনা ও সিদ্ধান্তের ওপর থেকে পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অন্যকে অনুসরণ করা বা ভালো কিছু দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া দোষের কিছু নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তি। কিন্তু এটি যখন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের পতন ঘটায়, তখন বিপদ অনিবার্য। নিজের সামর্থ্য বা ইচ্ছাকে গলা টিপে মেরে অন্যের মতো হওয়ার তীব্র তাগিদে যখন কারও পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা আর্থিক জীবনে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়, তখন আর একে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
এ আত্মবিনাশী হুজুগের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায় লুকিয়ে আছে নিজেরই ভেতরে। মনোবিজ্ঞানী নুসরাত শারমিনের পরামর্শ হলো, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন। মনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘আমি কি এটা সত্যিই চাই, নাকি শুধু অন্যদের দেখে প্রলুব্ধ হচ্ছি?’ সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করা একেবারেই কমিয়ে আনতে হবে। নিজের সত্যিকারের প্রয়োজন, আর্থিক সামর্থ্য এবং ব্যক্তিগত পছন্দকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। দিনশেষে নিজের জন্য কোনটি সত্যিকার অর্থে ভালো, সেই হিসাব নিজেকেই কষতে হবে। কারণ, অন্যের ধার করা আলোয় হয়তো সাময়িক চমক তৈরি করা যায়; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রশান্তি মেলে না।
টিপস
- সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমিয়ে আনুন
- অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করবেন না
- হুজুগে পড়ে অযথা টাকা খরচ করবেন না
- যেকোনো ট্রেন্ড অনুসরণের আগে একটু ভাবুন
- নিজের সামর্থ্য ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিন
- নিজের যা আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে শিখুন



