মনের খেয়াল
ভালো থাকার চাপ

মডেল: রেজাউল করিম সোহাগ; সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
সবসময় ভালো থাকা সম্ভব নয়। তবু কেউ কেউ সেই অভিনয় করে যান, যা মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উত্তরণের উপায় জানাচ্ছেন মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘মনের বন্ধু’র লিড সাইকোলজিস্ট কাজী রুমানা হক
‘মন খারাপ রেখো না, সব ঠিক হয়ে যাবে, এত চিন্তা করো কেন?’— এমন সান্ত্বনা সমাজে প্রচলিত। কথাগুলো হয়তো ভালোবাসা থেকেই বলা হয়। কিন্তু কখনো কখনো এগুলোই আমাদের মনে এমন চাপ তৈরি করে, যেন সবসময় ভালো আর হাসিখুশি থাকা এবং সব পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে রাখাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যি কি সবসময় ভালো থাকা সম্ভব? নাকি এমন চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় নিজেদের অনুভূতিগুলোই অস্বীকার করতে শুরু করি।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তির বাড়িতে পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে, ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু সমস্যা চলমান। কিন্তু অফিসে সবাইকে হাসিমুখে সামলাচ্ছেন; আবার বাড়িতে বলছেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ কারণ তিনি চান না, কেউ তাকে দুর্বল ভাবুক কিংবা তার কষ্টের কথা শুনে বিরক্ত হোক। দিনের শেষে তিনি হয়তো নিজেও বুঝতে পারছেন না, তার কেমন লাগছে।
মন খারাপ হওয়া, ক্লান্তি অনুভব করা, হতাশা ঘিরে ধরা কিংবা কখনো কিছুই ভালো না লাগা— এসবই মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার অংশ। প্রতিটি অনুভূতির পেছনে এক বা একাধিক কারণ থাকতে পারে। দুঃখ মানেই দুর্বলতা নয়, রাগ মানেই খারাপ মানুষ হওয়া নয় আর ক্লান্তি মানেই আপনি ব্যর্থ বা সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। যখন আমরা বারবার নিজের কষ্টকে চাপা দিই কিংবা নিজেকে জোর করে ভালো রাখার চেষ্টা করি, তখন অনুভূতিগুলো বোঝা এবং সেগুলো সামলানোর সুযোগ কমে যেতে পারে। যেমন— কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে মনোমালিন্যের পর কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু নিজেকে বলছেন, ‘এসব নিয়ে আমার খারাপ লাগা উচিত নয়।’ এতে কষ্টটা দূর হওয়ার বদলে অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে। অথচ তিনি যদি নিজেকে বলতেন, ‘ঘটনাটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে আর এমন লাগাটা স্বাভাবিক,’ তাহলে নিজের অনুভূতি বোঝার একটি সুযোগ তৈরি এবং এটি নিয়ে কাজ করার জায়গাটি আরও স্পষ্ট হতো।
আমরা তাহলে কী করতে পারি?
প্রথমত, নিজের অনুভূতিকে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। মন খারাপ হলে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘আমার আসলে কী হয়েছে? এই মুহূর্তে কী প্রয়োজন? কোন চিন্তা আমার মন খারাপ করিয়ে দিচ্ছে?’
দ্বিতীয়ত, সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় না করে পেশাদার মানসিক চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে নিজের কথা ভাগ করে নিতে পারেন। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়; এটি নিজের যত্ন নেওয়ার একটি অংশ।
তৃতীয়ত, নিজের প্রতি অবাস্তব প্রত্যাশা কমানো জরুরি। প্রতিদিন সমান কর্মক্ষম থাকা, সব সম্পর্ক ঠিক রাখা কিংবা প্রতিটি পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা সম্ভব নয়। কোনোদিন শুধু নিজের কাজগুলো সামলে বিশ্রাম নিতে পারাও যথেষ্ট।
জীবনে সব দিন এক রকম যায় না। কোনোদিন আমরা হাসব, কোনোদিন কাঁদব, কোনোদিন খুব আত্মবিশ্বাসী বোধ করব, আবার কোনোদিন নিজের ওপরই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলব। এই পরিবর্তনশীল অনুভূতিগুলোর মধ্য দিয়েই জীবন এগিয়ে চলে। তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কি সত্যিই ভালো আছি, নাকি সবাইকে ভালো থাকার আশ্বাস দিতে দিতে নিজের অনুভূতিগুলো ভুলে যাচ্ছি?’
সবশেষে খেয়াল রাখা জরুরি, মানসিক সুস্থতা মানে সবসময় ভালো থাকা নয়; বরং ভালো, খারাপ ও মিশ্র অনুভূতিগুলো বুঝতে ও গ্রহণ করতে শেখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া।



