শরৎ এলো আলমারিতে

ছবি: আগামীর সময়
বর্ষার ওয়ার্ডরোবের বড় অংশ জুড়ে ছিল ব্যবহারিক পোশাক। দ্রুত শুকায়, বৃষ্টিতে সহজে নষ্ট হয় না, ভিজে গেলেও অস্বস্তি কম— এমন পোশাকই বৃষ্টির মৌসুমে বেশি কাজে লেগেছে। রেইনকোট, ওয়াটারপ্রুফ বা সিনথেটিক ফেব্রিক ছিল তাই নিত্যসঙ্গী। শরৎ এলেও এগুলো একেবারে তুলে রাখার প্রয়োজন নেই। দেশের আবহাওয়ায় এ সময়েও আকাশ ভেঙে হঠাৎ নামতে পারে বৃষ্টি। তবে যেসব পোশাক মূলত টানা বৃষ্টি ও ভেজা আবহাওয়ার জন্য রাখা, সেগুলো পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে আলমারির অন্য অংশে তুলে রাখতে পারেন। একই সঙ্গে শরতের পোশাককে করে দিতে পারেন জায়গা।
শরতে যেমন পোশাক
আলমারি গোছানোর সময় শুধু কোন পোশাক সরবে, তা ভাবলেই চলবে না; কোন পোশাক আবার ব্যবহার করা যাবে, সেটিও দেখা দরকার। গত মৌসুমের একটি কুর্তিকে হয়তো পুরনো মনে হচ্ছে; কিন্তু নতুন কোনো প্যান্ট বা স্কার্ফের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠতে পারে নয়া লুকের অংশ। একটি ডেনিম, সাদা শার্ট কিংবা নিউট্রাল রঙের ভার্সেটাইল পোশাক তাই কখনোই দ্রুত সরিয়ে রাখার তালিকায় যায় না; বরং এগুলো দুই ঋতুর মাঝের সময়টুকুতে সবচেয়ে বেশি কাজে লাগতে পারে।
দেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা জানালেন, শরতের ওয়ার্ডরোবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ফেব্রিককে। খুব ভারী নয়, আবার বর্ষার মতো অতিরিক্ত বৃষ্টিবান্ধবও নয়— এমন কাপড় এ সময় আরামদায়ক। কটন, খাদি, হালকা তাঁত, লিনেন বা লিনেন ব্লেন্ড, ব্রিদেবল ব্লেন্ডেড ফেব্রিক কিংবা পাতলা সিল্ক ব্লেন্ড দিয়ে তৈরি পোশাক হতে পারে ভালো বিকল্প। দিনের উষ্ণতা আর সকাল ও সন্ধ্যার তুলনামূলক আরামদায়ক; দুই আবহাওয়াতে মানানসই পোশাকই শরতের শুরুর দিনগুলোয় বেশি ব্যবহারযোগ্য।
খুব ভারী নয়, আবার বর্ষার মতো অতিরিক্ত বৃষ্টিবান্ধবও নয়— এমন কাপড় এ সময় আরামদায়ক
ফ্যাশন ব্র্যান্ড অঞ্জন’স-এর স্বত্বাধিকারী শাহিন আহমেদ মনে করেন, শরতে পোশাকের ধরনেও আসতে পারে সামান্য পরিবর্তন। কুর্তি, ঠোলা শার্ট, স্ট্রেইট বা ওয়াইড লেগ প্যান্ট, কটন মিডি ড্রেস, হালকা ওজনের স্কার্ট কিংবা হালকা ওড়না দিয়ে সহজেই তৈরি করা যায় কয়েকটি ভিন্ন লুক। খুব বেশি ট্রেন্ড ফলো না করে বরং একাধিকভাবে পরা যায়— এমন পোশাক বেছে নেওয়া ভালো। কারণ, ওয়ার্ডরোব আপডেট করার সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো কম পোশাকে বেশি কম্বিনেশন তৈরি করা।
রঙের জাদু
‘রঙের ক্ষেত্রেও শরৎ একটু আলাদা মুড নিয়ে আসে’— বললেন দেশি ব্র্যান্ড লা রিভের ফ্যাশন ডিজাইনার মারুফা শিল্পী। তার মতে, বর্ষার গাঢ় নেভি ব্লু, কালো, বটল গ্রিন বা মেরুনের সঙ্গে এই মৌসুমে জায়গা করে নিতে পারে সাদা, অফ-হোয়াইট, ক্রিম, বেজ, আকাশি, ডাস্টি পিঙ্ক কিংবা কোমল হলুদ রঙ। শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর কাশফুলের শুভ্রতা— প্রকৃতির এই রঙগুলো সরাসরি পোশাকে না এলেও তার কাছাকাছি টোনের প্যালেট পুরো লুকে এনে দিতে পারে সতেজ অনুভূতি।
পোশাকে কন্ট্রাস্ট তৈরি করাই হতে পারে এ সময়ের স্টাইলিংয়ের মূল কৌশল। একটি ক্রিম বা অফ-হোয়াইট আউটফিটের সঙ্গে ডিপ গ্রিন ব্যাগ, নেভি ব্লু শু কিংবা বার্গেন্ডি লিপস্টিক যোগ করলে লুকে আসতে পারে ডেপথ। আবার সম্পূর্ণ নিউট্রাল পোশাকের সঙ্গে একটি কালারফুল স্কার্ফ বা স্টেটমেন্ট জুয়েলারিই যথেষ্ট। অর্থাৎ রঙ বদলানোর চেয়ে রঙের ব্যবহার বদলানোও হতে পারে নতুন ঋতুর স্টাইলিং ট্রিক।
অ্যাকসেসরিজ চয়েজ
জুতার ক্ষেত্রে বর্ষার রাবার স্যান্ডেল বা ওয়াটারপ্রুফ ফুটওয়্যারের পাশাপাশি এবার আলমারিতে লোফার, স্নিকার, ব্যালেট ফ্ল্যাটস, মিউলস কিংবা কমফোর্টেবল স্যান্ডেলকে জায়গা করে দিন। অবশ্য পোশাক ও দৈনন্দিন চলাফেরার ওপর নির্ভর করে জুতা বেছে নেওয়া ভালো। অফিসে নিয়মিত যাতায়াত হলে লোফার বা স্নিকার, আর ক্যাজুয়াল আউটিংয়ের জন্য ফ্লাটস বা মিউলস হতে পারে সহজ সমাধান। কেননা একটি ভালো জুতা অনেক সময় পুরো আউটফিটের আবহ বদলে দিতে পারে।
ব্যাগ ও অন্যান্য অ্যাকসেসরিজের ক্ষেত্রেও খুব বেশি কিছু যোগ-বিয়োগের প্রয়োজন নেই। বর্ষার বড় ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগের পাশাপাশি শরতে একটি স্ট্রাকচার হ্যান্ডব্যাগ, সোল্ডার ব্যাগ কিংবা মাঝারি টোট ব্যাগ রাখা যেতে পারে। সঙ্গে স্কার্ফ, সানগ্লাস, ঘড়ি কিংবা মিনিমাল গয়না। বিশেষ করে জুয়েলারিতে এই মৌসুমে লেয়ার্ড কিন্তু ভারী নয়, এমন স্টাইলিং ভালো মানায়। একই পোশাকের সঙ্গে অ্যাকসেসরিজ বদলে একাধিক লুক তৈরি করা যায় বলেই এগুলো ওয়ার্ডরোব আপডেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সুবিধা হলো, সবকিছু নতুন করে কেনার দরকার নেই; বরং আগে দেখতে হবে আলমারিতে কী আছে। একটি সাদা শার্ট কতভাবে পরা যায়, একটি ডেনিমের সঙ্গে কত ধরনের টপ মানায়, প্যান্টের পাশাপাশি স্কার্টের সঙ্গে একটি কুর্তি পরা যায় কি না— এই হিসাব কষলে শপিং লিস্ট নিজে থেকেই ছোট হয়ে আসবে। এতে খরচ কমবে, ওয়ার্ডরোবের ব্যবহার বাড়বে; পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় পোশাকের স্তূপ জমার প্রবণতাও কমে আসবে।
মেকআপ ম্যাজিক
শরতে মেকআপে ছোটখাটো পরিবর্তন আনার ওপর জোর দিলেন বিউটি সেলুন জারা’স মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ফারহানা রুমি। তার মতে, বর্ষার আর্দ্রতায় দীর্ঘস্থায়ী মেকআপের দিকে বেশি মনোযোগ থাকে। শরতের দিনে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক মেকআপ রাখা যায়। খুব ভারী বেসের বদলে ন্যাচারাল লুকিং স্কিন, সফট ব্লাস, ডিফাইন্ড আইব্রো এবং ন্যুড লিপ শেড দিয়ে তৈরি হতে পারে এফোর্টলেস লুক। দিনের পোশাক এবং কাজের ধরন অনুযায়ী মেকআপের ইনটেনসিটি ঠিক করাই এখানে মূল কথা।
ঋতু বদলেছে বলেই ত্বক যত্নের সব পণ্য বদলে ফেলতে হবে, এমনটা নয়; বরং ত্বক কী চায়, সেটি বুঝে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করাই ভালো
চুলের স্টাইলিংয়েও একই ভাবনার কথা জানালেন বিউটি সেলুন রেড বাই আফরোজা পারভীনের প্রধান রূপ বিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন। তিনি বললেন, ‘বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ফ্রিজি ভাব সামলাতে গিয়ে যে চুল বেশির ভাগ সময় বাঁধা থাকে, শরতে সেটিকে কিছুটা স্বাভাবিকভাবে রাখা যায়। সফট ওয়েভ, লো বান, পনিটেইল কিংবা হাফ-আপ— সহজ কয়েকটি হেয়ারস্টাইল প্রতিদিনের লুকে পরিবর্তন আনতে পারে।’ তবে স্টাইলিংয়ের পাশাপাশি হেয়ার কেয়ারও জরুরি— জানালেন তিনি। তার মতে, বর্ষায় ঘন ঘন ভেজা, ঘাম ও আর্দ্রতার প্রভাব কাটিয়ে শরতে প্রয়োজন বুঝে চুলচর্চার রুটিন সামান্য বদলানো যেতে পারে।
ত্বকের আভা
ত্বকের যত্নেও সিজনাল ট্রানজিশন গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষার আর্দ্র আবহ আর শরতের তুলনামূলক পরিবর্তিত বাতাসে ত্বকের অনুভূতি এক রকম থাকে না। তাই ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লিনজার, ময়েশ্চারাইজার কিংবা বডি কেয়ারের টেক্সচার ঠিক করা দরকার। তবে ঋতু বদলেছে বলেই ত্বক যত্নের সব পণ্য বদলে ফেলতে হবে, এমনটা নয়; বরং ত্বক কী চায়, সেটি বুঝে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করাই ভালো। আর সানস্ক্রিন তো সারা বছরই গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষের দুনিয়া
পুরুষের ওয়ার্ডরোবও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। বর্ষার কুইক ড্রাই টি-শার্ট বা পোলোর সঙ্গে এবার যোগ হতে পারে কটন শার্ট, লিনেন ব্লেন্ড শার্ট, চিনোস, রিল্যাক্সড ট্রাউজার কিংবা হালকা ওভার শার্ট। পায়ে স্নিকার ও লোফারস দিয়ে তৈরি করা যায় ক্যাজুয়াল থেকে স্মার্ট ক্যাজুয়াল লুক। বিশেষ করে লেয়ারিংয়ের সুযোগ শরতের পোশাকে বাড়ে। একটি হালকা ওভারশার্ট দিনের পোশাককে সন্ধ্যার জন্যও উপযোগী করে তুলতে পারে।
ওয়ার্ডরোব আপগ্রেড
এ সময়কে ওয়ার্ডরোব ছাঁটাইয়ের সুযোগ হিসেবেও দেখা যায়। এখন পরব, পরে পরব, আপডেট করব, অন্যকে দেব— আলমারিতে থাকা পোশাকগুলোকে এমন কয়েকটি ভাগে আলাদা করা যেতে পারে। যে পোশাক এক বছর ধরে পরা হয়নি, সেটি কেন জমিয়ে রাখা হচ্ছে, সেই ভাবনাও জরুরি। কোনো পোশাক সামান্য অলটারেশন করলে যদি আবার ব্যবহারযোগ্য হয়, সেটিকে বাদ না দিয়ে রিপেয়ার করা যায়। এতে ওয়ার্ডরোব যেমন হালকা হয়, তেমনই পোশাকের আয়ুও বাড়ে।
এই গোছানোর সঙ্গে বদলে যেতে পারে শপিং হ্যাবিটও। নতুন ঋতু মানেই নতুন কালেকশন নয়; বরং কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা ভালো— এটি কি ওয়ার্ডরোবের অন্তত তিনটি পোশাকের সঙ্গে পরা যাবে? সত্যিই কি এ ধরনের আরেকটি পোশাক প্রয়োজন? শুধু ট্রেন্ড দেখে নাকি দীর্ঘদিন ব্যবহার করার জন্য কেনা? এ কয়েকটি প্রশ্নই অতিরিক্ত শপিং অনেকটাই কমাতে পারে।
যাপনে রদবদল
ঋতু বদলের সঙ্গে জীবনযাপনের ধরনও বদলানো দরকার। বর্ষার টানা বৃষ্টি, স্যাঁতসেঁতে আবহ আর ঘরকেন্দ্রিক দিনের পর শরৎ নিয়ে আসে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক সময়। তাই এ সময়কে বলা যেতে পারে নিজের দৈনন্দিন রুটিনে ছোট্ট একটি রিসেট আনার সুযোগ। ঘুম ও জাগরণের সময় ঠিক করা, রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কমানো এবং সকালে কিছুটা সময় নিজের জন্য রাখা দিয়ে শুরু হতে পারে এই পরিবর্তন।
শরতের সকালকে কাজে লাগানো যেতে পারে হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম, বই পড়া কিংবা নিরিবিলি কিছু সময় কাটানোর জন্য। বর্ষায় কমে যাওয়া আউটডোর অ্যাকটিভিটি ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনা যায়। ঘরের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন জরুরি। জানালা খুলে আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি বিছানার চাদর, পর্দা ও কুশন কভার পরিষ্কার এবং ওয়ার্ডরোবে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করা যেতে পারে।
খাবারের ক্ষেত্রেও চাই একটু ভারসাম্য। পর্যাপ্ত পানি, মৌসুমি ফল, শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস জরুরি। আর সবশেষে, ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা দরকার। গান শোনা, বই পড়া, হাঁটা কিংবা কিছুক্ষণ ফোন থেকে দূরে থাকা— শরতের এ সময়টুকু হতে পারে শরীরের পাশাপাশি মনেরও সতেজ হওয়ার সুযোগ।








