টপে টিপটপ

মডেল: অ্যাঞ্জেলা ডি’কস্টা; পোশাক: লা রিভ; সাজ: শামীম; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
কিশোরী থেকে পরিণত নারী— কাটছাঁট, রঙ আর নকশার বৈচিত্র্যে টপেই তারা পরিপাটি। লিখেছেন রেজাউল আহমেদ
জিনস, পালাজ্জো, ট্রাউজার কিংবা স্কার্ট— বটমলাইনে যে পোশাকই হোক, ওপরের পারিপাট্যে টপের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। কখনো ঢিলেঢালা, কখনো শরীরের গড়ন ছুঁয়ে থাকা, কখনোবা পাফ স্লিভ, অমসৃণ হেমলাইন কিংবা ড্রেপিংয়ের অভিনবত্বে নজর কাড়ে এ পোশাক। কিশোরী ও তরুণীদের ক্যাম্পাসে যাওয়া থেকে কর্মজীবী নারীর অফিস, বন্ধুদের আড্ডা থেকে সন্ধ্যার আয়োজন— বিভিন্ন বয়স ও উপলক্ষে মানিয়ে যায় টপ। কাটছাঁট, কাপড়, রঙ ও অনুষঙ্গের সঠিক সমন্বয়ে একই পোশাকেও তৈরি করা সম্ভব একাধিক লুক।
কাটছাঁটের কারুকাজ
টপের সৌন্দর্যের বড় অংশ নির্ভর করে এর কাটছাঁটের ওপর। একই রঙের কাপড়েও নকশার পার্থক্যে তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন লুক। স্ট্রেইট কাটের টপে থাকে পরিচ্ছন্ন ও পরিমিত মেজাজ। অন্যদিকে, পেপলাম টপের কোমরের কাছের বাড়তি ঘের পোশাকে যোগ করে ছন্দ। কোমরের ওপর থেকে ছড়িয়ে পড়া এ নকশা মানিয়ে যায় সরু প্যান্ট, সিগারেট ট্রাউজার কিংবা স্কার্টের সঙ্গে। এ-লাইন টপ নিচের দিকে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে বলে চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায়। বক্সি টপের প্রশস্ত গড়ন ও তুলনামূলক ছোট দৈর্ঘ্য এনে দেয় আধুনিক অবয়ব। আবার অ্যাসিমেট্রিক বা অসমান হেমলাইনের টপে কখনো এক পাশ লম্বা, কখনো সামনে ও পেছনে থাকে দৈর্ঘ্যের তারতম্য। সাধারণ প্যান্টের সঙ্গেও এমন টপে তৈরি হয় আলাদা ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
হাতার নকশায় জাদু
পাফ স্লিভে কাঁধের কাছে বাড়তি ভলিউম থাকে, যা পোশাকে আনে রোমান্টিক আবহ। বেল স্লিভের হাতা কবজির দিকে প্রশস্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, থ্রি-কোয়ার্টার কিংবা স্ট্রেইট হাতার টপে পরিধানকারীকে দেখায় ছিমছাম। স্লিভলেস টপ গরমের দিনে আরামদায়ক। ক্যাপ স্লিভ কিংবা ছোট হাতার টপেও থাকা যায় স্বচ্ছন্দ। হাতার নকশা বেছে নেওয়ার সময় নিজের পছন্দের পাশাপাশি পোশাকের সামগ্রিক গড়ন ও ব্যবহারের উপলক্ষ বিবেচনায় রাখা ভালো।
একই রঙের কাপড়েও নকশার পার্থক্যে তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন লুক
নেকলাইনে নতুনত্ব
গোল গলার টপ দৈনন্দিন পোশাকে সহজে মানিয়ে যায়। স্কয়ার নেকলাইনে থাকে জ্যামিতিক সৌন্দর্য আর বোট নেক কাঁধের রেখা প্রশস্তভাবে তুলে ধরে। ভি নেকের নকশা গলায় লম্বাটে অবয়ব তৈরি করে। কলারযুক্ত টপে ফরমাল লুক ফুটে ওঠে, যা কর্মক্ষেত্র কিংবা পরিপাটি নৈমিত্তিক স্টাইলের জন্য উপযোগী। এ ছাড়া ঢেউখেলানো গলার নকশা কিংবা ড্রেপড নেকলাইনে কাপড়ের ভাঁজ তৈরি করে আনা সম্ভব সূক্ষ্ম নতুনত্ব। নজরকাড়া গলার নকশায় সাধারণ গয়নাতেই মানাবে ভালো; যেমন স্কয়ার নেকলাইনের সঙ্গে ছোট পেনড্যান্ট কিংবা খোলা গলার টপের সঙ্গে সূক্ষ্ম চেইন।
কাপড়ে স্বাচ্ছন্দ্য
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সুতি কাপড়ের টপ সুবিধাজনক। বাতাস চলাচলে সুবিধা হয় বলে গরমে স্বস্তি মেলে। লিনেনের টপেও থাকে হালকা ও স্বাভাবিক আবহ; যদিও এমন কাপড়ে সহজে ভাঁজ পড়ে। রেয়ন বা ভিসকসের টপ সাধারণত কোমল হয় এবং তাতে সহজে বায়ু চলাচল করে। ফলে ড্রেপিং কিংবা ঢিলেঢালা নকশায় এগুলো ভালো মানায়। শিফন ও জর্জেটের মতো হালকা কাপড়ে তৈরি টপে পাওয়া যায় উৎসবমুখর আবহ। তবে কাপড়ের স্বচ্ছতা, ভেতরের আস্তরণ এবং ব্যবহারের পরিবেশ বিবেচনায় রাখা জরুরি। ডেনিম কিংবা টুইলের টপ তুলনামূলক কাঠামোবদ্ধ গড়ন দেয়। ঋতু, আবহাওয়া ও ব্যবহারের ধরন বুঝে কাপড় নির্বাচন করলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্যও বজায় থাকে।
বয়সের সঙ্গে রুচির বৈচিত্র্য
কিশোরীদের প্রিন্টেড টপ, রঙিন গ্রাফিকস, স্ট্রাইপ, বক্সি কাট কিংবা ছোট হাতার নকশায় ভালো লাগে। জিনস, কার্গো প্যান্ট বা ডেনিম স্কার্টের সঙ্গে এসব টপে থাকা যায় দিনভর প্রাণবন্ত। ক্যাম্পাসে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরিতে আরামদায়ক কাপড় ও সহজে নড়াচড়া করা যায়— এমন কাটছাঁট গুরুত্ব দেওয়া ভালো। বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী নারীরা পোশাকে বৈচিত্র্য আনতে পারেন ক্রপ টপ, পেপলাম, ড্রেপড কিংবা অ্যাসিমেট্রিক নকশায়। কর্মজীবী নারীর জন্য কলারযুক্ত টপ, সোজা কাট কিংবা পরিমিত নকশার পোশাক সহজে মানানসই। একই টপ অফিসে ট্রাউজারের সঙ্গে পরে সন্ধ্যায় গয়না ও জুতা বদলে নিলে তৈরি হবে ভিন্ন লুক। চল্লিশ বা তার বেশি বয়সের নারীর জন্যও টপের নকশায় রয়েছে নানা সম্ভাবনা। একরঙা টপ, সূক্ষ্ম প্রিন্ট, থ্রি-কোয়ার্টার হাতা, নরম কাপড়ের ড্রেপিং কিংবা সুন্দর গলার নকশায় তৈরি হতে পারে মার্জিত সাজ। লম্বা বা মাঝারি দৈর্ঘ্যের টপের সঙ্গে স্ট্রেইট কাটের প্যান্ট কিংবা পালাজ্জো দারুণ মানায়। তবে এগুলো কোনো বয়সের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম নয়। যে নকশা ভালো লাগে, যে পোশাকে স্বচ্ছন্দ বোধ হয়, সেটিই বেছে নিতে পারেন।
বটমলাইনের সঙ্গে টপের রঙের সমন্বয় স্টাইলকে আরও পরিপাটি করে
রঙের খেলা
বটমলাইনের সঙ্গে টপের রঙের সমন্বয় স্টাইলকে আরও পরিপাটি করে। সাদা, কালো, ধূসর, বেইজ কিংবা নেভি ব্লুর মতো রঙ সহজেই নানা পোশাকে মানানসই এবং এগুলো বারবার পরার সুযোগ বেশি। অন্যদিকে, লাল, ফুশিয়া, কোবাল্ট ব্লু, ল্যাভেন্ডার, পেস্তা গ্রিন কিংবা বাটার ইয়েলোর মতো রঙ পোশাকে এনে দিতে পারে উজ্জ্বলতা। ফুলেল ছাপ, জ্যামিতিক নকশা, ডোরাকাটা কিংবা বিমূর্ত প্রিন্টের টপেও তৈরি হয় আলাদা বৈশিষ্ট্য। ছাপা টপের সঙ্গে একরঙা প্যান্ট বা স্কার্ট পরলে পারিপাট্যে ভারসাম্য থাকে। আবার একরঙা টপের সঙ্গে প্রিন্টেড স্কার্ট কিংবা নকশা করা প্যান্টেও আসতে পারে নতুনত্ব।
ক্রপ, লং নাকি বক্সি
ক্রপ টপ সাধারণত কোমরের কাছাকাছি শেষ হয়। হাই-ওয়েস্ট প্যান্ট বা স্কার্টের সঙ্গে এটি পরলে পোশাকের সৌন্দর্য সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। যারা শরীরের বেশি অংশ ঢাকা রাখতে চান, তারা একই ধরনের নকশার একটু লম্বা টপ বেছে নিতে পারেন। দৈর্ঘ্য বাছাইয়ে শুধু ফ্যাশন নয়; ব্যবহার উপযোগিতা ও আয়োজনকেও বিবেচনায় রাখা দরকার।
ড্রেপিং ও লেয়ারিংয়ের চমক
টপের নকশায় ড্রেপিং ব্যবহার করলে পোশাক পায় ভিন্নমাত্রা। কাপড়ের ভাঁজ এক পাশে জমিয়ে রেখে কোমরের কাছে জড়ো করে কিংবা গলার অংশে ঢেউ তৈরির মাধ্যমে এ ধরনের নকশা করা হয়। ড্রেপড টপের সঙ্গে স্ট্রেইট কাটের ট্রাউজার বা সরু প্যান্ট পরলে পোশাকের গড়ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লেয়ারিংও টপের নকশায় আনে আভিজাত্য। সাধারণ টপের ওপর খোলা শার্ট, হালকা জ্যাকেট কিংবা ওয়েস্টকোট পরলে তৈরি হয় ভিন্ন অবয়ব। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস কিংবা সন্ধ্যার আয়োজনে এ কৌশল কাজে আসে। তবে একাধিক স্তরের পোশাক বাছাইয়ের সময় কাপড়ের পুরুত্ব ও দৈর্ঘ্যের সামঞ্জস্য জরুরি।
টপের দৈর্ঘ্য বাছাইয়ে শুধু ফ্যাশন নয়; ব্যবহার উপযোগিতা ও আয়োজনকেও বিবেচনায় রাখা দরকার
দেশি-বিদেশি ট্রেন্ড
দেশীয় ফ্যাশনে টপের নকশায় দেখা যাচ্ছে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। সুতি কাপড়ে ব্লকপ্রিন্ট, ফুলেল নকশা, সুতার কাজ, জামদানি বুনন কিংবা দেশীয় মোটিফের ব্যবহার টপে যোগ করছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কামিজের আদলে তৈরি লম্বা টপ, ঢিলেঢালা কাট এবং আরামদায়ক কাপড়ের পোশাকও রয়েছে অনেকের পছন্দের তালিকায়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ফ্যাশনে বক্সি সিলুয়েট, অ্যাসিমেট্রিক হেমলাইন, পেপলাম, ড্রেপড নকশা ও বিভিন্ন ধরনের স্লিভের ব্যবহার টপের সাজে আনছে বৈচিত্র্য। ক্রপ টপের পাশাপাশি শার্ট-স্টাইল টপ, নিট টপ ও লেয়ারিংয়ের উপযোগী নকশাও নজর কাড়ছে। রঙ ও প্রিন্টে রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কখনো একরঙা মিনিমাল সাজ, কখনো চোখে পড়ার মতো জ্যামিতিক নকশা কিংবা উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি ট্রেন্ড থেকে নিজের পছন্দ, আবহাওয়া ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে মানানসই নকশা বেছে নিলেই টপের সাজে যোগ হবে নতুন মাত্রা।
অফিস থেকে সন্ধ্যার আয়োজন
কর্মক্ষেত্রে টপ পরতে চাইলে বেছে নেওয়া যায় কলারযুক্ত, স্ট্রেইট কাট কিংবা পরিমিত পেপলাম নকশার পোশাক। একরঙা টপের সঙ্গে স্ট্রেইট কাটের ট্রাউজার, পরিপাটি জুতা ও মাঝারি আকারের ব্যাগে তৈরি হয় পেশাদার সাজ। খুব বেশি ঝুল, কাটআউট কিংবা অতিরিক্ত স্বচ্ছ কাপড়ের বদলে কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানানসই নকশা বেছে নেওয়া ভালো। আড্ডা কিংবা ঘোরাঘুরির জন্য সুতি টপ, ডেনিম প্যান্ট ও আরামদায়ক জুতা বেছে নিতে পারেন। সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে সাটিনের টপ, ড্রেপড নকশা কিংবা সূক্ষ্ম কারুকাজ করা পোশাকের সঙ্গে পরা যায় মানানসই ট্রাউজার বা স্কার্ট। মজার ব্যাপার হলো, গয়না ও ব্যাগের ধরন বদলেই একই টপকে ভিন্ন উপলক্ষের উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
অনুষঙ্গে পূর্ণতা
টপে পারিপাট্যে পূর্ণতা দিতে গয়না, ব্যাগ ও জুতার ভূমিকা কম নয়। নকশা করা কিংবা পাফ স্লিভের টপের সঙ্গে ছোট কানের দুল ও সরল নকশার ব্যাগ মানানসই। অন্যদিকে, সাদামাটা টপে বড় কানের দুল, লম্বা মালা কিংবা স্তরে স্তরে চেইন যোগ করলে বৈচিত্র্য আসবে। তবে গলার নকশা ও গয়নার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। জুতার ক্ষেত্রেও পোশাকের ধরন বিবেচনায় রাখতে হবে। স্নিকার্সে নৈমিত্তিক মেজাজ, লোফারে পরিপাটি অবয়ব আর হিল জুতায় প্রকাশ পাবে আনুষ্ঠানিকতার ছেঁায়া। ছোট, টোট কিংবা কাঁধে ঝোলানো— ব্যাগ বেছে নিতে পারেন প্রয়োজন ও উপলক্ষ অনুযায়ী।






