ঢাকা মহাসড়কে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষের দাবিটি ভিত্তিহীন

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ঢাকা মহাসড়কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষ’—এমন একটি দাবি করে একটি অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও ক্লিপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৭ জুলাই ‘বৃহত্তর আওয়ামীলীগ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে আলোচিত দাবিতে এই ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। ভিডিওটির কমেন্ট বা মন্তব্য বক্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ সাধারণ ব্যবহারকারীই এটিকে সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা বলে বিশ্বাস করেছেন।
তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো রাজনৈতিক সংঘর্ষের নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে মিরপুর-১০ এলাকায় লাগা আগুনের একটি পুরোনো ভিডিও, যাতে কৃত্রিমভাবে রাজনৈতিক স্লোগান জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
ভাইরাল ভিডিওর বিবরণ ও অডিও অসঙ্গতি
আলোচিত ২০ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ফুটওভারব্রিজের নিচে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে এবং ঘন কালো ধোঁয়া ও আগুনের শিখা উঠছে। ভিডিওতে আশপাশে উৎসুক জনতাকে আগুনের দৃশ্য দেখতে ভিড় করতে দেখা যায় এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ছবি বা ভিডিও ধারণ করছেন। এছাড়া ঘটনাস্থলে কয়েকজনের হাতে লাঠিও দেখা যায়।
ভিডিওটির সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি রয়েছে এর অডিওতে। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে হাততালির শব্দের পাশাপাশি ‘রক্তে আগুন লেগেছে’, ‘দিয়েছি তো রক্ত আরও দেব রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’—ইত্যাদি রাজনৈতিক স্লোগান দিতে শোনা যায়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে ভিডিওতে দৃশ্যমান ঘটনার ও মানুষের শারীরিক অভিব্যক্তির কোনো মিল পাওয়া যায় না, যা থেকে অডিও সম্পাদনার প্রাথমিক সন্দেহ তৈরি হয়।
মূল ভিডিওর উৎস ও প্রকৃত প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ে এর কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে ‘রিভার্স ইমেজ সার্চ’ করা হলে মূলধারার একাধিক গণমাধ্যমে এর আসল উৎস খুঁজে পাওয়া যায়।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘সময় টিভি’-এর ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ‘মেট্রোরেলের নিচে ফুটওভার ব্রিজে আগুন’ শিরোনামের ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর বেশকিছু দৃশ্যের হুবহু মিল রয়েছে। এছাড়া একই দিনে ‘ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন’-এর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ‘মিরপুরে আগুনের ভেতর দিয়ে ছুটছে মেট্রোরেল’ শিরোনামের ভিডিওতেও ঠিক একই দৃশ্য দেখা যায়।
জিওলোকেশন অনুসন্ধান
আরও অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর বাংলা ওয়েব সংস্করণে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ‘মিরপুর-১০ পুলিশ বক্সে আগুন: সীমিত হলো মেট্রোরেল চলাচল’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যের নিখুঁত মিল রয়েছে। এছাড়া গুগল ম্যাপস ব্যবহার করে জিওলোকেশন যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আলোচিত ভিডিওর স্থানটি মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকা।
তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন) চলাকালে মিরপুর-১০ এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের তীব্র সংঘর্ষের একপর্যায়ে সেখানে অবস্থিত পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেল চলাচল আংশিক সীমিত করা হয়েছিল।
পেজগুলোর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
আলোচিত দাবিতে ভুয়া ভিডিওটি ছড়ানো ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এই আইডি ও পেজগুলো থেকে নিয়মিতভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ) পক্ষে এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়ে থাকে।
সামগ্রিক তথ্য ও সংবাদমাধ্যমের অকাট্য প্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, ‘ঢাকা মহাসড়কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষ’ দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও কৃত্রিমভাবে তৈরি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে মিরপুর-১০ গোলচত্বরের পুলিশ বক্স ও ফুটওভার ব্রিজে লাগা আগুনের একটি পুরোনো ভিডিও ক্লিপ কেটে, তার মূল শব্দ পরিবর্তন করে রাজনৈতিক স্লোগান জুড়ে দিয়ে চলমান সময়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষের দৃশ্য দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।






