ইউপি নির্বাচনে এইচএসসি-এসএসসি সনদ বাধ্যতামূলক দাবিটি সত্য নয়

ছবি: আগামীর সময়
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে— ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে এইচএসসি এবং মেম্বার পদে এসএসসি সনদের মূল কপি ছাড়া মনোনয়নপত্র বাতিল করা হবে।’ নির্বাচন কমিশন সচিবের বরাতে প্রচারিত এই দাবিটি প্রমাণের জন্য ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিক ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর একটি পেপার কাটিংও যুক্ত করা হয়েছে।
তবে তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। নির্বাচন কমিশন ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীর জন্য এমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করেনি। এছাড়া ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর নামে ছড়িয়ে পড়া পেপার কাটিংটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দিয়ে তৈরি করা একটি ভুয়া ছবি।
আইনের বিধান ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য
প্রচারিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার কোনো গণমাধ্যম কিংবা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
২০০৯ সালের ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন’ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী ইউপি চেয়ারম্যান বা মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। অর্থাৎ, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও আইনগতভাবে যেকোনো নাগরিক প্রার্থী হতে পারেন।
বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার স্পষ্ট করেছেন যে—ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। হাইকোর্টের রুলটি পর্যালোচনা, বিদ্যমান আইন এবং আদালতের নির্দেশনা বিবেচনা করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর ভুয়া পেপার কাটিং ও এআই বিশ্লেষণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর পেপার কাটিংটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এতে নকশা (ডিজাইন), ফন্ট, শব্দের মধ্যকার দূরত্ব (স্পেস), বানানের ভুল এবং অপ্রাসঙ্গিক হিন্দি লেখার মতো একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
কাটিংটিতে প্রকাশের তারিখ উল্লেখ করা ছিল ১৯ মে, ২০২৬। তবে ওই তারিখে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট কিংবা ছাপা সংস্করণে এমন কোনো খবরের দেখা মেলেনি। ডিজিটাল কারসাজি নিশ্চিত হতে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলস ‘Hive Detect’-এর সহায়তা নেওয়া হলে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছবিটি এআই (AI) দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ।
গুজবের পটভূমি ও কারণ
হঠাৎ এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে গত ২২ জুলাই জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-তে প্রকাশিত একটি সংবাদ পাওয়া যায়, যার শিরোনাম ছিল— ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিতে নির্দেশ কেন নয়’।
সংবাদটি থেকে জানা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা (অন্তত স্নাতক) নির্ধারণের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীর করা রিটের প্রাথমিক শুনাহির পর আদালত এই রুল দেন। রিটকারীদের যুক্তি ছিল—২০০৯ সালের আইনে যোগ্যতা না থাকলেও গ্রাম আদালত আইনের অধীনে একজন ইউপি চেয়ারম্যান বিচারিক ক্ষমতা ও জরিমানা আরোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যার জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন।
উচ্চ আদালতের এই রুল জারির ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এবং গুজব বা ডার্ক প্যাটার্ন তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন ও ভুয়া পেপার কাটিং বানিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সার্বিক তথ্য-প্রমাণ ও আইন বিশ্লেষণ শেষে এটি শতভাগ নিশ্চিত যে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে এইচএসসি ও মেম্বার পদে এসএসসি সনদের মূল কপি ছাড়া মনোনয়ন বাতিল হওয়ার তথ্যটি সম্পূর্ণ গুজব। বর্তমানে বহাল থাকা আইনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। নির্বাচন কমিশন সচিবের বরাতে প্রচারিত বার্তা এবং 'বাংলাদেশ প্রতিদিন'-এর পেপার কাটিং দুটিই সম্পূর্ণ ভুয়া ও বানোয়াট।







