শব্দজাদুকর গুলজারের জন্মদিন আজ

গুলজার
সত্তরের দশকে হিন্দি সিনেমায় যখন অ্যাকশন সিনেমার জোয়ার, তখন ভিন্ন গল্পের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘কোশিশ’ ও ‘আঁধি’ দর্শকদের মন জয় করে নেয়। ‘কোশিশ’-এ বাকপ্রতিবন্ধী দম্পতির চরিত্রে সঞ্জীব কুমার ও জয়া ভাদুড়ী এবং ‘আঁধি’-তে সঞ্জীব কুমার ও সুচিত্রা সেনের অনবদ্য অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গভীর দাগ কেটে আছে।
চলচ্চিত্র দুটির পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও গীতিকার গুলজার। গীতিকার হিসেবে সাফল্য পাওয়ার পর তিনি ভিন্নধারার সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেন। বলা যায়, হিন্দি চলচ্চিত্রে পরীক্ষামূলক কাজ করার পথ তিনিই প্রথম তৈরি করেছিলেন। গানে তার অবদান সত্যিই অসামান্য; লেখার প্রতিটি ছত্রে জীবনের গভীর ভাব ফুটে ওঠে। এমনকি চারপাশের অতি সাধারণ ঘটনাকেও খুব সহজে সুন্দর গানে রূপ দেওয়ার এক জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে তার।
ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ভুবনে যার কলমের স্পর্শ কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, সেই কালজয়ী কবি, গীতিকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা গুলজার পা রাখলেন জীবনের ৯২তম বসন্তে। আজ এই মহান শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৩৪ সালের এই দিনে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করা সম্পূরণ সিং কালরা কালক্রমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান কেবল ‘গুলজার’ নামে।
দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ, রাগ, অভিমান ও ভালোবাসার মতো আবেগগুলোকে গানের ভাষায় জীবন্ত করে তোলা যেন তার সহজাত ক্ষমতা। পাশাপাশি তার চমৎকার আবৃত্তি ও সংলাপ পরিবেশনের ভঙ্গি যেকোনো শ্রোতাকেই মুগ্ধ করে।
শুধু গান বা আবৃত্তিতেই নয়, চিত্রনাট্য রচনায়ও তিনি অনন্য। উপমহাদেশের খ্যাতনামা অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত ‘মির্জা গালিব’ টিভি সিরিজের গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, চিত্রনাট্য তৈরি, পরিচালনা এবং গালিবের গানগুলোকে দর্শকনন্দিত করার পেছনে পুরো অবদানই ছিল তার। আর তার এই অসাধারণ সৃষ্টির কারণেই সিরিজটি আজও দর্শকরা মনে রেখেছেন।
তবে, শিল্প-সাহিত্যের রাজকীয় চূড়ায় ওঠার আগে গুলজারের শুরুর দিনগুলো মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। জীবনযাপনের তাগিদে একসময় মুম্বাইয়ের এক গাড়ির গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
ছোট বেলায় তিনি তার বাবার দোকানে থাকতেন। বাজারে দোকানের কাছেই ছিল এক লাইব্রেরি। মাত্র চার আনায় সেখান থেকে বই নিয়ে পড়া যেত। সেখান থেকে গোয়েন্দা গল্প ও রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী দিয়ে শুরু করেছিলেন। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ মালীর ইংরেজি অনুবাদ পড়ার পর গুলজারের বই পড়ার ভাব এবং ধরন পুরোপুরি বদলে যায়। সাহিত্যের প্রতি অদম্য ভালোবাসাই তাকে পরবর্তীতে নিয়ে আসে রুপালি জগতে।
১৯৬০-এর দশকে বিখ্যাত নির্মাতা বিমল রায়ের কালজয়ী সিনেমা ‘বন্ধিনী’-র গানে গীতিকার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম কাজের মধ্য দিয়েই তার স্বতন্ত্র কাব্যিক ভাষার জাদু নজর কাড়ে সবার, যা হিন্দি সিনেমা জগতের গানের ধারাকেই বদলে দিয়েছিল।
কেবল গান লিখেই থেমে থাকেননি গুলজার। সত্তরের দশকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় নাম লেখান তিনি। ‘মেরে আপনে’, ‘কোশিশ’, ‘আঁধি’, ‘মৌসুম’ ও ‘আঙ্গুর’-এর মতো মাস্টারপিস সিনেমা উপহার দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রে পরিচালক হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন।
২০০৮ সালের বিশ্বখ্যাত সিনেমা ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’-এর কালজয়ী গান ‘জয় হো’র কথা লিখেছিলেন গুলজার। সুরকার এ.আর. রহমানের সাথে জুটি বেঁধে ২০০৯ সালের ৮১তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে (অস্কার) সেরা মৌলিক গানের পুরস্কার লাভ করেন এই ভারতীয় গীতিকার।
অস্কারের পর গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডেও জয়জয়কার হয় ‘জয় হো’ গানের। ২০১০ সালে ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার সেরা গান হিসেবে এ. আর. রহমান ও তানভি শাহর সাথে যৌথভাবে গ্র্যামি পুরস্কার পান গুলজার, যা তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে আরেকটি বড় আন্তর্জাতিক অর্জন।
চলচ্চিত্রে অনন্য ও অবিশ্বাস্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় তাকে ৪৫তম দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করে। এটি ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মাননা।
সিনেমার বাইরে সাহিত্য অঙ্গনেও তার প্রভাব অপরিসীম। হিন্দি ও উর্দু ভাষায় তার লেখা অনন্য সব কবিতা ও ছোটগল্প নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যমুখী করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিটি সাধারণ মুহূর্তকে শব্দের পরশে অসাধারণ করে তোলার জাদুকর গুলজার আজও তার সৃষ্টি দিয়ে মুগ্ধ করে চলেছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সাহিত্য ও চলচ্চিত্রপ্রেমীকে। জীবনের এই বিশেষ দিনে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।







