হলিউডের চোখে ইরান শুধুই কি সন্ত্রাস আর ভিলেনের দেশ?

বেন অ্যাফ্লেক পরিচালিত ‘আর্গো’ সিনেমাটি ২০১২ সালে মুক্তি পায়
বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনা সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে এই সংঘাত যখন চরমে পৌঁছায়, তখন অনেক হলিউড তারকাকেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করতে দেখা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, কেবল প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করাই কি যথেষ্ট? দশকের পর দশক ধরে হলিউডের সিনেমাগুলোতে ইরানকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, হলিউড সবসময়ই ইরানকে একটি নেতিবাচক এবং ভীতিকর রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে।
হলিউডের সিনেমায় ইরান মানেই যেন সংঘাত, সন্ত্রাস আর কড়াকড়ির এক জনপদ। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া বেন অ্যাফ্লেকের ‘আর্গো’ সিনেমাটি এর অন্যতম উদাহরণ। ১৯৭৯ সালের তেহরান দূতাবাসের জিম্মি সংকট নিয়ে নির্মিত এই ছবিতে ইরানকে অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এবং সহিংস হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইরানি সাংবাদিক হোলি দাগরেস এক রিপোর্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব তাদের নিজেদের স্বার্থে এবং যুদ্ধের প্রচারণা চালাতে গিয়ে ইরান সম্পর্কে এই ধরণের ভুল ও গতানুগতিক ধারণা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
২০১৪ সালে মুক্তি পায় ‘রোজওয়াটার’। একজন সাংবাদিকের ২০০৯ সালের ইরান নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ এবং পরবর্তীতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক হওয়ার গল্প নিয়ে এটি নির্মিত। সিনেমাটি ইরানি দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি এবং সেখানকার সমালোচকরা একে ‘হলিউডের প্রোপাগান্ডা’ বা মিথ্যা প্রচারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি অনেক সমালোচক সিনেমার নির্মাতাদের ‘ভ্রান্ত’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেন।
২০১৫ সালের সিনেমা ‘সেপ্টেম্বরস অব শিরাজ’। আদ্রিয়ান ব্রডি এবং সালমা হায়েক অভিনীত এই ছবিতে দেখানো হয়েছে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় এক ধনী ইহুদি ব্যবসায়ীকে জেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং তার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হয়। বিপ্লব পরবর্তী ইরানের অরাজকতা তুলে ধরতে গিয়ে সিনেমাটি যেন আরও একবার দেশটির ভাবমূর্তিকে খাটো করেছে।
তবে সব সিনেমাই যে একপাক্ষিক, তা নয়। ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এ সেপারেশন’ সিনেমাটি হলিউডের না হলেও এটি পশ্চিমা বিশ্বের দর্শকদের চোখ খুলে দিয়েছিল। একটি ইরানি পরিবারের সাধারণ জীবনের টানাপোড়েন আর নৈতিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সিনেমাটি ইরানকে ভিন্নভাবে চিনিয়েছে। এছাড়া ‘দ্য স্টোনিং অফ সুরাইয়া এম’ এবং মারজান সাত্রাপির আত্মজীবনী অবলম্বনে নির্মিত ‘পারসেপোলিস’ সিনেমাগুলোতেও ইরানের মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং আবেগপূর্ণ জীবনের গল্প উঠে এসেছে।
সমালোচকরা মনে করেন, চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী মাধ্যমে কোনো দেশ বা জাতিকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক চশমায় দেখা উচিত নয়। হলিউড যদি তাদের ছকবাঁধা ‘ভিলেন’ চরিত্র থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ ইরানিদের জীবনের গল্পগুলো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরে, তবেই হয়তো বৈশ্বিক এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে।



