সৃষ্টির রহস্য
রইদে শব্দ ও ছবির ঘোর

রইদ। চলচ্চিত্রকার: মেজবাউর রহমান সুমন
মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’ চলচ্চিত্রটি সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে বোদ্ধাদের মধ্যেও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফার ও সাউন্ড ডিজাইনারের বয়ানে জানা যাক এর আবহসংগীত ও চিত্রমালার গল্প
সিনেমার নিজস্ব শ্বাস খোঁজা গুরুত্বপূর্ণ ছিল
জোয়াহের মুসাভভির জ্যোতি
সিনেমাটোগ্রাফার
প্রতিটি সিনেমারই নিজস্ব গন্ধ, টেক্সচার ও ছন্দ থাকে। ‘রইদ’-এর ক্ষেত্রে আমার প্রথম কাজ ছিল সেই নিজস্ব শ্বাস খুঁজে বের করা। তারপর যতটা সম্ভব সেটাকে স্পষ্ট করে তোলা— নিজের কিছু চাপিয়ে না দিয়ে। চরিত্রগুলোর ভেতরের অবস্থা, তাদের নীরবতা, অস্বস্তি, ভাঙাচোরা অনুভূতি— এসব যেন ক্যামেরার ভেতর দিয়ে অনুভব করা যায়, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই ছবির প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই হ্যান্ডহেল্ড। ক্যামেরা, পারফরমার, প্রকৃতি ও স্পেস— সব মিলিয়ে একটা ট্যাঙ্গো বা জ্যাজের মতো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কেউ কাউকে পুরোপুরি অনুসরণ করছে না, কেউ নেতৃত্বও দিচ্ছে না। সবাই যেন একে অন্যের উপস্থিতি শুনে, বুঝে, সেই মুহূর্তে সাড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে ঘরের ভেতর ক্যামেরাকে অতিথি না বানানোটা আমার কাছে খুব জরুরি ছিল। ক্যামেরা যেন ওই ঘরেরই একজন হয়ে যায়— নিঃশব্দ, অদৃশ্য, বিনয়ী। অনেক সময় মনে হয়েছে, এই ছবিতে আমার সবচেয়ে বড় চেষ্টা ছিল কোনো কাজ না করা। নিজের উপস্থিতিকে যতটা সম্ভব সরিয়ে রাখা, যেন মুহূর্তটা নিজে নিজেই ঘটতে পারে।
আমার সবচেয়ে বড় চেষ্টা ছিল কোনো কাজ না করা। নিজের উপস্থিতিকে যতটা সম্ভব সরিয়ে রাখা, যেন মুহূর্তটা নিজে নিজেই ঘটতে পারে
প্রায় পুরো ছবিটাই আমার জন্য নতুন করে ভাবার জায়গা ছিল। কতটুকু দেখাব আর কতটুকু না দেখিয়ে রেখে দেব—প্রশ্নটা বারবার এসেছে। রইদ আমাকে একটু কম কাজ করার, একটু চুপ করে থাকার, আর একটা মুহূর্তকে নিজের মতো থাকতে দেওয়ার দিকে নিয়ে গেছে।
কারিগরি দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ভেবেছি রাত নিয়ে। রইদের রাত, অমাবস্যা, পূর্ণিমা আর জ্যোৎস্না ছিল ভাবনা জুড়ে। আমরা সিনেমায় প্রায়ই রাত দেখি, কিন্তু রাতের অনুভূতির দেখা খুব একটা পাই না। পূর্ণিমাকে শুধু আলো হিসেবে নয়, তার ভেতরের নীরবতা, আবহ আর উপস্থিতিটাকে কীভাবে দেখা সম্ভব— এই প্রশ্ন আমাকে অনেক দিন ধরেই ভাবিয়েছে। রইদ আমাকে সেই প্রশ্নের ভেতর দিয়ে হাঁটার সুযোগ দিয়েছে। রাতকে কীভাবে দেখা যায়, জ্যোৎস্নাকে কীভাবে অনুভব করা যায়— এই অনুসন্ধান আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
একজন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে আমি চাই, একটা সিনেমা আমাকে তার পৃথিবীর মধ্যে নিয়ে যাক। দর্শক যেন প্রথমে না ভাবে, ‘কী সুন্দর শট!’ বরং দৃশ্যটার অনুভূতিটা যেন তার মধ্যে থেকে যায়। আমার কাছে সিনেমাটোগ্রাফির সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তখনই, যখন সেটা দৃশ্যমান থেকেও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এই জায়গা থেকে রইদ আমাকে অনেকটাই সন্তুষ্ট করেছে। পুরোপুরি সন্তুষ্ট বলব না; নিজের কাজ নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হওয়া বোধ হয় সম্ভবও না। বরং ছবিটা আমাকে কিছু জায়গায় শান্তি দিয়েছে, আবার কিছু জায়গায় নতুন প্রশ্নও করেছে হাজির। সেটাও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমার একটা বিশ্বাস আছে— সিনেমা আসলে আমরা বানাই না; এটি আমাদের ভেতর দিয়ে ঘটে যায়। আমাদের কাজ শুধু তার সঙ্গে সুর মেলানো। তার ছন্দ আর অনুভূতির প্রতি সৎ থাকা।
রইদের অভিজ্ঞতা আমার কাছে অনেকটা সেরকমই ছিল— একটা ঘোরের মধ্যে থাকা; নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। আর সেই ঘোরের ভেতর দিয়ে সিনেমাটাকে নিজের মতো করে ঘটতে দেওয়া।
শব্দ দিয়ে ইউনিভার্স সৃষ্টি করতে চেয়েছি
রাশিদ শরীফ শোয়েব
ফিল্ম মিউজিক কম্পোজার, সাউন্ড ডিজাইনার এবং রি-রেকর্ডিং মিক্সার
‘রইদ’-এ সংলাপ থেকে শুরু করে প্রকৃতি, বাতাস, গরু-মহিষের শব্দ— শুটিং লোকেশনে যেসব ঘটনা ঘটছে, যাবতীয় আওয়াজ আমরা প্রথমত ডায়জেটিক সাউন্ড হিসেবে শুনেছি, তারপর অথেনটিকভাবে রেকর্ড করার চেষ্টা করেছি। লোকেশন সাউন্ড রেকর্ড করেছেন সজীব রঞ্জন বিশ্বাস। সেগুলোর ওপরই পরে যা দরকার, তা যোগ করে এমন একটি ইউনিভার্স সৃষ্টি করতে চেয়েছি, যেন শব্দ দিয়েও দর্শক সেই ইউনিভার্সের সঙ্গে কানেক্ট করতে পারে।
আমি, সজীব ও রাজেশ সাহা— আমরা তিনজন স্টুডিওতে একসঙ্গে কাজ করেছি। সঙ্গে ফিল্মটির নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন ও সম্পাদক সজল অলোকও ছিলেন। মিউজিক ও সাউন্ড ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা চিন্তাভাবনায় একটি জায়গায় থিতু হতে চেয়েছি। এই চলচ্চিত্রের প্রতিটি মুহূর্তেই যেহেতু প্রকৃতি উপস্থিত, ফলে প্রাকৃতিক শব্দগুলোর এবং এরকম দুজন মানুষের জীবনযাপনের মাঝখানে এমন কিছু সাউন্ড জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যেগুলোকে কোনোমতেই যেন বিচ্ছিন্ন মনে না হয় বা আরোপিত না লাগে।
সৃষ্টিকালে রইদের সঙ্গে প্রায় দুই বছর কাটিয়েছি। আর তা আমাকে অনেকভাবেই ভাবিয়েছে। সেই ভাবনা মিলিয়ে এটি একটি সুন্দর জার্নি, যা আমি ভালোবেসেছি
আমি সাউন্ড ডিজাইনার বা রি-রেকর্ডিং মিক্সার যতটুকু, আবার ফিল্ম মিউজিক কম্পোজারও ততটুকু। ফলে এই দুটো ব্যাপারকে আলাদা করে দেখি না। একটি সিনেমার শব্দ এবং সংগীত— এই দুটো ব্যাপার যখন এক হয়ে একটি অনুভূতির সৃষ্টি করে, সেই ছবিগুলোই আমাকে বেশি টানে। একটি ছবির ভেতরে সেই সম্ভাবনা থাকতে হবে, যেটির ওপরে আপনি আপনার আর্ট নিয়ে সঙ্গী হতে পারবেন। রইদ এমনই একটি ছবি। সোজাসাপ্টা দেখলে সরল প্রেমের ছবি হলেও এটি আসলে একটি খোলা ক্যানভাস, যেটিকে নানাজন নানাভাবে ভাষান্তর করতেই পারেন। রইদকে আমরা যেভাবে ভাবতে চেয়েছি, সেই জায়গা থেকে এর শব্দ ও সংগীত নিয়ে কানেক্ট করার ক্ষেত্রে সৎভাবে শতভাগ চেষ্টা আমার পক্ষ থেকে ছিল। বাকিটুকু দর্শকের ভাবনার ওপর ছেড়ে দিয়েছি।
সৃষ্টিকালে রইদের সঙ্গে প্রায় দুই বছর কাটিয়েছি। আর তা আমাকে অনেকভাবেই ভাবিয়েছে। সেই ভাবনা মিলিয়ে এটি একটি সুন্দর জার্নি, যা আমি ভালোবেসেছি।
আমার ধারণা, ঢাকাকেন্দ্রিক ফিল্মমেকিংয়ে অনেক ক্ষেত্রেই শব্দকে হয়তো অবহেলা করা হয় কিংবা যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া উচিত, ততটুকু দেওয়া হয় না। ছবির শব্দ ঠিক থাকলে মানুষ সাধারণত সেটি খেয়াল করে না। কারণ, শব্দের প্রতি এটি মানুষের একধরনের সহজাত প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কোনো শব্দ যখন ঠিকঠাক কাজ করে না, কোনো কারণে যদি সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য না লাগে, তখনই দর্শক তা খেয়াল করে। তার মনে হয়, ‘আচ্ছা, এটাকে ঝামেলা লাগছে। কোথাও একটা সমস্যা আছে।’ আমার ভীষণ পছন্দের বাঙালি সাউন্ড ডিজাইনার সুকান্ত মজুমদার একবার বলেছিলেন, ‘ক্যামেরা যতটুকু দেখাতে চায়, আমরা ছবি আসলে ততটুকুই দেখি। এর পরের জগৎটা তো পুরোপুরি শব্দের জগৎ।’ শব্দের জগৎটা আসলে অসীম। সিনেমাতে শব্দের ব্যবহার আপনি যতটুকু অর্জন করতে চাইবেন, ততটুকু পাওয়ারই সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনা আমরা হয়তো পরিপূর্ণভাবে এক্সপ্লোর করতে চাই না— বাজেট বা সময়ের অভাবে কিংবা ভাবনার দৈন্যের কারণে। আমি যেহেতু একজন মিউজিশিয়ান, আর মিউজিক মানেও শব্দ; ফলে শুরু থেকেই আমার আগ্রহ ছিল এমন কিছু কাজ করার, যেখানে নিজের অনুভূতিগুলোর যথার্থ ভাষান্তর করতে পারব। সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করি, সিনেমার ৫০ ভাগ শব্দ আর ৫০ ভাগ ইমেজ। সেই বিশ্বাস থেকেই কাজ করে যাচ্ছি।








