মেরিলিন: আজও অমলিন

মেরিলিন মনরো। (জন্ম: ১ জুন ১৯২৬ মৃত্যু: ৪ আগস্ট ১৯৬২)
মৃত্যুর ছয় দশক পরও জনপ্রিয়তা কমেনি মেরিলিন মনরোর। গত ১ জুন ছিল এই তারকার জন্মশতবার্ষিকী। তার জীবনের কম আলোচিত কিছু বিষয় নিয়ে লিখেছেন ইসমত মুমু
বইপোকা মনরো
বই পড়তে ভালোবাসতেন মেরিলিন মনরো। ১৯৬২ সালে মৃত্যুর সময় তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ৪০০টির বেশি পাওয়া যায়। তার সংগ্রহে ছিল মার্সেল প্রুস্ত, আলব্যার কামু, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জেমস জয়েস, লিও টলস্টয়সহ বিশ্বসাহিত্যের বহু বিখ্যাত লেখকের বই। পাশাপাশি তিনি পড়তেন উইলিয়াম ব্লেক, ওয়াল্ট হুইটম্যান ও ডব্লিউ বি ইয়েটসের কবিতা। মনোবিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতি ও ইতিহাসবিষয়ক বইও ছিল তার সংগ্রহে। ১৯৫১ সালে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। মনরো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পড়াশোনা মানুষের আত্মবিকাশে সহায়তা করে। নিজের অনিরাপত্তাবোধ ও আত্মসন্দেহ কাটিয়ে উঠতেও তিনি বইয়ের আশ্রয় নিতেন। মৃত্যুর পর তার বইগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ছিল। পরে সেগুলোর বড় একটি অংশ নিলামে বিক্রি করা হয়।
অভিনয় শেখার সংগ্রাম
ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত অ্যাক্টরস স্টুডিওতে ভর্তি হয়েছিলেন মনরো। অভিনয় শেখার স্কুলটিতে তখন লি স্ট্রাসবার্গ মেথড অ্যাক্টিং শেখাতেন। স্ট্রাসবার্গের এই পদ্ধতিতে অভিনেতাদের শেখানো হতো নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, আবেগ এবং স্মৃতি কাজে লাগিয়ে চরিত্রকে আরও বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। এরপরই তার অভিনয়ে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায়। বাস্তবতা ফুটে ওঠে এমন চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘বাস স্টপ’, ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ ও ‘সাম লাইক ইট হট’-এর মতো সিনেমাগুলো।
হলিউডের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
চুক্তিবদ্ধ থাকার কারণে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টোয়েন্টি সেঞ্চুরি ফক্স তাকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। ১৯৫৪ সালের শেষ দিকে মেরিলিন মনরো সিদ্ধান্ত নেন স্টুডিও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার। তিনি টোয়েন্টি ফক্স স্টুডিওর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ‘মেরিলিন মনরো প্রোডাকশনস’ প্রতিষ্ঠা করেন। লভ্যাংশ দেওয়াসহ নানারকম সুবিধা নিয়ে তৈরি হয় স্টুডিওটি। এতে ফক্স ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করে এবং সাময়িকভাবে তাকে নিষিদ্ধও করে। তবে মনরো নিজের অবস্থানে অটল থাকেন। দীর্ঘ দরকষাকষির পর ১৯৫৬ সালে ফক্স তার সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে বাধ্য হয়, যেখানে তিনি চারটি সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি গল্প নির্বাচন ও পরিচালক অনুমোদনের অধিকার পান এবং লাভের অংশীদারত্বও নিশ্চিত হয়। মেরিলিন মনরো ‘বাস স্টপ’ ও ‘দ্য প্রিন্স অ্যান্ড দ্য শোগার্ল’-এর মতো সিনেমা প্রযোজনা করেছিলেন। যদিও পরে ব্যক্তিগত জটিলতার কারণে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি বেশিদূর এগোয়নি। তবে একজন নারী অভিনেত্রী হিসেবে মনরো যে সাহস দেখিয়েছিলেন, তা উদাহরণ হয়ে থাকে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনে সমর্থন
পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্য ছিল ব্যাপক। কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীরা অনেক নামি ক্লাব ও বিনোদন কেন্দ্রে পারফর্ম করার সুযোগ পেতেন না। সেই সময় লস অ্যাঞ্জেলেসের জনপ্রিয় ‘মোক্যাম্বো নাইটক্লাব’-এ গান গাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন না এলা ফিটজেরাল্ড। ক্লাব কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল, একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী শিল্পী দর্শক টানতে পারবেন না। এ সময় মেরিলিন মনরো নিজেই উদ্যোগ নেন। তিনি ক্লাবের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান, এলা ফিটজেরাল্ডকে সেখানে গান গাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি নিজে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের আলোকচিত্রীদেরও সেখানে নিয়ে আসবেন, যাতে বিষয়টি ব্যাপক প্রচার পায়। মেরিলিনের জনপ্রিয়তার কারণে ক্লাব কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যায়। অনুষ্ঠানগুলো ব্যাপক সাফল্য পায় এবং এরপর এলা ফিটজেরাল্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরও বড় বড় মঞ্চের দরজা খুলে যায়। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের সঙ্গে প্রকাশ্যে বন্ধুত্ব বজায় রাখতেন। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেত্রী রোজা পার্কস ও নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে যখন সমঅধিকারের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন মেরিলিন মনরোর মতো একজন শ্বেতাঙ্গ সুপারস্টারের এই সমর্থন বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছিল।





