কেন সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের নেতা বানায় তামিলনাড়ু

তামিল নায়কদের রাজনীতির প্রতি ঝোঁকের পেছনে গত কয়েক দশকের নেতৃত্বের শূন্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতি আর রুপোলি পর্দার নায়ক এই দুইয়ের সম্পর্ক যেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। ভারতের এই দক্ষিণি রাজ্যে সিনেমার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে রাজনীতির ময়দান দখল করার ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৪০ ও ৫০ এর দশকে দ্রাবিড় আন্দোলনের সময় থেকেই সিনেমার পর্দা রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।
পর্দার নায়কদের বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাড়াতে দেখে ভক্তরা বাস্তব জীবনেও তাদের ত্রাতা হিসেবে মেনে নেয়। এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই যুগে যুগে তামিল নায়করা আকৃষ্ট হয়েছেন রাজনীতির প্রতি। বর্তমান ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঝোঁক আরও বেড়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এই পথচলার শুরুটা হয়েছিল কিংবদন্তি এমজিআর বা এম.জি. রামচন্দ্রনের হাত ধরে। তিনি ১৯৭২ সালে ডিএমকে থেকে বেরিয়ে নিজের দল এআইএডিএমকে গঠন করেন এবং ১৯৭৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা দায়িত্ব পালন করেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে।
জয়ললিতার মতো তারকারাও পরবর্তীতে সিনেমার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছান। জয়ললিতা ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৯১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে মোট ছয়বার শপথ নেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। তবে কেবল তারাই নন, অভিনেতা শিবাজি গণেশনও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, যদিও এমজিআরের মতো সাফল্য পাননি তিনি।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে অভিনেতা বিজয়কান্ত তার নিজস্ব দল ডিএমডিকে গঠন করেন এবং ২০১১ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হয়ে আলোচনায় আসেন।
বর্তমানে এই ধারায় বড় চমক হিসেবে হাজির হয়েছেন সুপারস্টার থালাপতি বিজয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তার রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেট্ট্রি কাঝাগাম’ টিভিকে গঠনের ঘোষণা দেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে লক্ষ্য করে তিনি রাজনীতিতে এতটাই মনোনিবেশ করেছেন যে ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গত ২৩ এপ্রিল ভারতের দক্ষিণি রাজ্য তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা নিয়ে এখন টানটান উত্তেজনা বইছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সবার নজর এখন ৪ মে-র দিকে, সেদিন জানা যাবে কার হাতে যাচ্ছে রাজ্যের ক্ষমতা। তবে এরই মধ্যে বুথফেরত সমীক্ষা বা ‘এক্সিট পোল’ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছে ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ এর সমীক্ষা। তারা বলছে, প্রথমবারের মতো ভোটে নেমেই সুপারস্টার বিজয়ের দল ৯৮ থেকে ১২০টি আসন পেয়ে বাজিমাত করতে পারে এবং DMK জোটের ৯২ থেকে ১১০টি আসন । মূলত তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের বড় একটা অংশ বিজয়ের দিকে ঝুঁকেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে তামিল রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হবে।
তবে বাকি তিনটি বড় সমীক্ষা বলছে, DMK জোটই সরকার গড়বে, যদিও গতবারের চেয়ে তাদের আসন কিছুটা কমতে পারে।
কিন্তু যদি কোনো দলই সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসন না পায়, তবে বিজয় ‘কিং মেকার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন। বুথ ফেরত জরিপে মিলেছে তেমনই আভাস। তিনটি সংস্থার বুথ ফেরত জরিপের ফল অনুযায়ী, বিজয়ের দল পেতে পারে ১০ থেকে ৩০টির মতো আসন। তখন ডিএমকে বা অন্য দলের সরকার গড়তে লাগবে বিজয়ের সুদৃষ্টি। তখন ক্ষমতার চাবিকাঠি থাকবে বিজয়ের হাতেই। ৪ মে ফলাফল যদি ত্রিশঙ্কু হয়, তবে বিজয়ই ঠিক করবেন তামিলনাড়ুর পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন।
তামিলনাড়ুর বর্তমান উপ-মুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি স্ট্যালিন ২০১৯ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন এবং ২০২৪ সালে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এছাড়া কিংবদন্তি অভিনেতা কমল হাসান ২০১৮ সালে তার দল ‘মাক্কাল নিধি মাইয়াম’ গঠন করে এখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছেন। অভিনেতা শরৎ কুমারও নিজের দল গঠন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে বড় রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে যুক্ত হয়। আবার অভিনেতা ও পরিচালক সিম্যান ২০১০ সালে ‘নাম তামিলার কাচ্চি’ গঠন করে তামিল জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
তামিল নায়কদের এই রাজনীতির প্রতি ঝোঁকের পেছনে গত কয়েক দশকের নেতৃত্বের শূন্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০১৬ সালে জয়ললিতা এবং ২০১৮ সালে করুণানিধির মৃত্যুর পর তামিল রাজনীতিতে যে পরিবর্তন আসে, সেখানে নতুন কোনো ক্যারিশম্যাটিক মুখের খোঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যদিও রজনীকান্ত ১৯৯০ এর দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনীতিতে আসার ইঙ্গিত দিয়েও শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্যগত কারণে সরে দাড়ান, তবুও বিজয় বা সিম্যানদের মতো নতুন মুখদের কারণে সিনেমা আর রাজনীতির এই সম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে।
এমনকি অভিনেত্রী খুশবু সুন্দর বা গৌতমীর মতো তারকারাও ২০১০ সালের পর থেকে বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের হয়ে মাঠ গরম করছেন।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নির্বাচন এখন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং সেলুলয়েডের জনপ্রিয়তা ও বাস্তব রাজনীতির এক বড় পরীক্ষা।









