ইউজিসির অনুমোদন না মেনে নিয়োগ, নোবিপ্রবির ১৭ শিক্ষকের বেতন বন্ধ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়— সংগৃহীত
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন উপেক্ষা করে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ায় ১৭ জন শিক্ষকের বেতন-ভাতা বরাদ্দ দেয়নি কমিশন। ইউজিসি থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট-সংক্রান্ত নথিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অনুমোদিত পদ পরিবর্তন করে অন্য বিভাগে এবং উচ্চ পদের বিপরীতে নিম্ন পদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া এক বিভাগের জন্য বরাদ্দ করা পদে অন্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ এবং উচ্চ পদের বিপরীতে নিম্ন পদে নিয়োগকে অনুমোদনের শর্তের ব্যত্যয় ও আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইউজিসি।
নথি অনুযায়ী, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইলের সময়ে এসব পদ পরিবর্তন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউজিসির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কমিশনের অনুমোদন অমান্য করে নিজেদের মতো করে পদের নাম ও বিভাগ পরিবর্তন করে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইউজিসির নথিতে উল্লেখ করা নিয়োগগুলোর মধ্যে রয়েছে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদ পরিবর্তন করে ইইই বিভাগে সহকারী অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে আইন বিভাগে প্রভাষক, আইসিই বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক, ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে বিএমবি বিভাগে প্রভাষক এবং শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদ পরিবর্তন করে এমআইএস বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগ।
এ ছাড়া আইআইএস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদ পরিবর্তন করে একই বিভাগে প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদ পরিবর্তন করে রসায়ন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে আইআইএস বিভাগে প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে প্রাণীবিদ্যা বিভাগে প্রভাষক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আরও রয়েছে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক, টিএইচএম বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদ পরিবর্তন করে ফিমস বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদ পরিবর্তন করে সমাজকর্ম বিভাগে সহকারী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে সিএসটিই বিভাগে প্রভাষক এবং এফটিএনএস বিভাগের প্রভাষক পদ পরিবর্তন করে আইন বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইউজিসির পর্যবেক্ষণে এসব নিয়োগকে নিয়মবহির্ভূত উল্লেখ করে কমিশনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পদগুলোর বেতন-ভাতা পরিশোধ স্থগিত রাখা এবং এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ পদের বিপরীতে নিম্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হওয়ায় ওই পদগুলোর বেতন-ভাতা বাবদ কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।
নতুন হাতে আসা ইউজিসির ‘সংলগ্নী-০৩’ নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশনের বাজেট অ্যাসেসমেন্ট দল নোবিপ্রবির ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটের অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শাখায় মোট ২৫টি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউজিসি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ স্থগিত রাখার নির্দেশনা দিলেও মানবিক কারণ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ তামজিদ হোসাইন চৌধুরী বলেছেন, ‘এ বিষয়ে ইউজিসি একটি কমিটি গঠন করেছে। বিষয়টি নিয়ে ইউজিসির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বললেন, ‘বিগত সময়ে যেসব নিয়োগ হয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করার বিষয়ে রিজেন্ট বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। বিগত সময়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তদন্ত কমিটি তা উদঘাটন করবে।’
ইউজিসি ১৭ জন শিক্ষকের বেতন বরাদ্দ না দেওয়ার বিষয়ে উপাচার্য বলেছেন, ‘বিভাগ পরিবর্তন করে শিক্ষক নিয়োগ শুধু অন্তর্বর্তীকালীন সময়েই হয়নি; এর আগেও এ ধরনের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিগত সময়ে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই এসব নিয়োগ দিয়েছেন। এটি প্রশাসনে থাকা সংশ্লিষ্টদের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউজিসি এসব শিক্ষকের বেতন ছাড় না করলেও মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের বেতন চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। বিষয়টি নিয়ে ইউজিসিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। কমিটি যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’







