উৎসব ভাতা
দুই শিক্ষকের পকেটেই পৌনে ২ কোটি, বাকিদের ‘সেমাইয়ের টাকা’

সংগৃহীত ছবি
বেসরকারি শিক্ষকদের ঈদ মানেই উৎসবের চিড় ধরা আনন্দ— সেমাই-চিনি কিনবেন, না ছেলেমেয়েদের জন্য পোশাক? সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের বোনাস যেখানে মূল বেতনের সমপরিমাণ, সেখানে তারা পেতেন মাত্র ২৫ শতাংশ (বর্তমানে ৫০ শতাংশ)। অনেক বেসরকারি শিক্ষক তাই মজা করে বলেছেন, ‘এই টাকায় ঈদ নয়, শুধু সেমাই হয়।’
এই যখন অবস্থা, তখন এই স্কুলের দুই শিক্ষক ঘটিয়েছেন অভাবনীয় ঘটনা। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক বোনাস নিয়েছেন ‘ভিআইপি প্যাকেজে’। একজন শিক্ষক যেখানে দুটি ঈদে বোনাস পান মোট ১৪-১৫ হাজার টাকা, সেখানে এই দুজন ১০ বছরে নিয়েছেন পৌনে দুই কোটি টাকা।
তাদের একজন হলেন সাহাব উদ্দিন মোল্লা, যিনি প্রধান শিক্ষক থেকে এখন অবসরে। আর দ্বিতীয়জন সহকারী শিক্ষক দেলুয়ার হোসেন, বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে। তারা ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল— এই ১০ বছরে এ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে ধরা পড়েছে এই জালিয়াতি।
তদন্তে বলা হয়েছে, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলে মোট লুট করেছেন ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
বেসরকারি শিক্ষকরা যেখানে শতভাগ উৎসব ভাতার দাবিতে রাজপথে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আন্দোলন করছেন, তখন রাজধানীর নামি স্কুলটিতে ধরা পড়েছে লুটপাটের এই চিত্র।
যেভাবে লুট ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা
তদন্তে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষক সাহাব উদ্দিন মোল্লা তার বেতন-ভাতার বাইরে স্কুল থেকে প্রতি মাসে কখনো ৯৮ হাজার, কখনো ৭৫ হাজারের অতিরিক্ত নিতেন। তবে কোনো মাসেই ৭৫ হাজার টাকার কম নেননি। ১০ বছরে এই টাকার পরিমাণ ৯৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেলুয়ার হোসেন, যিনি সাহাব উদ্দিনের সময় সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনিও দুর্নীতিতে কম যাননি। সমান তালে পা মিলিয়ে তিনি অবৈধভাবে পকেটে ঢুকিয়েছেন ৮০ লাখ ২৮ হাজার ৬১২ টাকা।
এই দুই শিক্ষকের নেওয়া অবৈধ টাকার পরিমাণ ১ কোটি ৭৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০০ টাকা। তদন্তকারীরা এই টাকা নেওয়া অবৈধ ঘোষণা করে তা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ তহবিলে ফেরত আনার সুপারিশ করেছেন।
সাধারণ শিক্ষকদের উৎসব ভাতা
সরকারের বিধি অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষক কিংবা সহকারী প্রধান শিক্ষক মূল বেতনের ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা পেতেন (বর্তমানে ৫০ শতাংশ)। অর্থাৎ মূল বেতন যদি ২৯ হাজার টাকা হয়, তবে তিনি বোনাস পেতেন মাত্র ৭ হাজার ২৫০ টাকা।
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনটি এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টেবিলে। গত বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি অনুমোদন করে ব্যবস্থা নিতে জমা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এই অভিনব উৎসব ভাতা নেওয়া দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়, তা দেখতে চান স্কুলটির শিক্ষক-কর্মচারীর।
তদন্ত কর্মকর্তা ডিআইএর সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘নিরীক্ষাকালে এই দুজন শিক্ষকের আর্থিক নথিপত্র, বেতন-ভাতা রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে এসব অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছি। বিধিবহির্ভূতভাবে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা আদায় করে ফেরত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করছি।’
মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শুধু অতিরিক্ত উৎসব ভাতাই নয়, প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ, হিসাব সংরক্ষণ, কর-ভ্যাট পরিশোধ এবং ক্রয় প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়ম করার প্রমাণ মিলেছে। বিষয়গুলো এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেলুয়ার হোসেন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে কী লেখা হয়েছে, আমি জানি না। তবে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্য নয়। কারণ একজন সাধারণ শিক্ষক যে হারে বোনাস নিয়েছেন, আমিও সেভাবেই নিয়েছি এবং তা ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়েছি।’
অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক সাহাব উদ্দিন মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।






