প্রশিক্ষণ নিয়েই শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছেন ৬১৩ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা
- শুরুতেই প্রশিক্ষণ, বদলাচ্ছে পুরনো রীতি
- এক সপ্তাহের ওরিয়েন্টেশনে পাঠদান ও পেশাগত আচরণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
- পেশাদারিত্ব বাড়াতে আগে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা

যোগদানের আগেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। ছবি: কর্মকর্তাদের সৌজন্যে
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের আগেই শিক্ষকদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো ৪৯তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ৬১৩ নবীন কর্মকর্তাকে এক সপ্তাহের ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষকতার শুরুতেই পাঠদান কৌশল, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, পেশাগত আচরণ ও সরকারি চাকরির নিয়মকানুন সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন তারা। শিক্ষকদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে সরকারের এ উদ্যোগকে শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনও নবীন শিক্ষকদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর উদ্যোগের উদ্বোধন করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) আয়োজনে গত ১৩ অক্টোবর বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (আরডিএ) এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়।
আজ সোমবার এর সমাপনী অনুষ্ঠান হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নায়েমের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. ওয়াসিম মোহা. মাযহারুল হক। সূচনা বক্তব্য দেন নায়েমের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) এবং কোর্স পরিচালক মো. শাহজাহান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে শিক্ষা ক্যাডারের নবীন কর্মকর্তাদের সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদায়ন করা হতো। পরে তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। এতে অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছর পর প্রশিক্ষণ নিতে হতো। এবার শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের আগেই এক সপ্তাহের প্রাথমিক ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষকতার বাস্তব দায়িত্ব পালনের আগে নবীন কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় কিছু মৌলিক ধারণা নিয়ে কর্মজীবন শুরু করতে পারবেন।
নায়েমে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য চার মাসব্যাপী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে চাকরিতে যোগদানের পরপরই অনেকের সেই প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে চার বছরও অপেক্ষা করতে হয়। এ অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার আগে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ নবীন শিক্ষকদের জন্য বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি করছে।
এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে বলেছেন, একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার আগেই পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতেই এ উদ্যোগ। আমরা চাই, নবীন শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নিয়েই শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করুন। ভবিষ্যতে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে।
এ ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আগামীর সময়কে বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য হলো, শিক্ষকদের মৌলিক প্রশিক্ষণ দিয়েই শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসা। এজন্য সব স্তরের শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই লক্ষ্যেই মন্ত্রণালয় ও মাউশির নির্দেশনায় ৪৯তম বিসিএসের ৬১৩ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে মৌলিক প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নায়েমের পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) ও কোর্স পরিচালক মো. শাহজাহান বলেছেন, এবারই প্রথম একসঙ্গে ৬১৩ নবীন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর আগে ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছি। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার আগেই তার কাজের ধরন, পাঠদানের কৌশল, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ এবং পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করুন। শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না, সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার দক্ষতাও প্রয়োজন। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নবীন কর্মকর্তারা শিক্ষকতা পেশার মৌলিক বিষয়গুলো বুঝে কর্মজীবন শুরু করার সুযোগ পাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমানের মতে, প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে পাঠানো উচিত নয়। নায়েম ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদও শিক্ষক নিয়োগের আগে প্রাক্-চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে মনে করেন। তার মতে, এ ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।



