‘এক বছরে এক বিসিএস’ শুধুই স্বপ্ন!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর, ৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। পরের বছর ২৭ মে হয় পরীক্ষা, যার ফল বের হয় ২২ জুন। এরপর ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে লিখিত পরীক্ষা।
এর এক বছরের বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল প্রকাশ করা হয় লিখিত পরীক্ষার ফল। কিন্তু গোল বাধে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পথ পেরিয়ে দেশের অন্য প্রতিষ্ঠানের মতো পিএসসিতেও স্থিতি ফিরতে সময় লাগে, যার ঢেউ সরাসরি লাগে ৪৬তম বিসিএসে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল থেকে শুরু হয় মৌখিক পরীক্ষা।
আবার এই ৪৪তম বিসিএসের ফলাফল ঘিরেও ছিল নাটকীয়তা। তৃতীয়বারের মতো সম্পূরক ও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয় ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর। যেখানে সুপারিশ করা হয় ১ হাজার ৬৭৬ প্রার্থীর নাম।
শুধু এই বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশ দিতেই পিএসসির লেগেছে পুরো চার বছর, যা বিসিএসের ইতিহাসে রেকর্ড। সেই পিএসসি এখন বলছে, প্রতিবছর একটি করে বিসিএস পরীক্ষা হবে, ওই বছরই সব কাজ শেষ করে প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করা হবে।
এটি যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বলতে হবে, অসাধ্য সাধন করেছে পিএসসি। তবে অন্তত ১০টি বিসিএসের ফল বিশ্লেষণ করে সরকারের এ সংস্থাটির ওপর সে ভরসা ঠিক আনা যাচ্ছে না। তাই ‘এক বছরে এক বিসিএস’ শুধু স্বপ্ন হয়েই রয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে। যার চূড়ান্ত সুপারিশ হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে, অর্থাৎ সময় লেগেছে ৩ বছর ১ মাস। ৪১তম বিসিএসে লেগেছে ৩ বছর ৮ মাস, ৪০তম বিসিএসে সময় লেগেছে ৩ বছর ৬ মাস, ৩৮তম বিসিএসে সময় লেগেছে ৩ বছর ১০ দিন। ৩৯তম ও ৪২তম ছিল বিশেষ বিসিএস, এগুলোতে শুধু প্রিলিমিনারি ও মৌখিক পরীক্ষা হওয়ায় সময় কম লেগেছে। সেটিও অবশ্য খুব কম নয়, চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত ৪২তম বিসিএসে সময় লেগেছে ৯ মাস ১০ দিন এবং ৩৯তম বিসিএসে সময় লেগেছে ১ বছর ২২ দিন।
অর্থাৎ, বিসিএস নামের এই ‘সোনার হরিণ’ ধরতে একজন প্রার্থীকে গড়ে অপেক্ষা করতে হয় তিন থেকে চার বছর। অথচ ‘এক বছর এক বিসিএস’— সরকারের এ ঘোষণা এসেছে পাঁচ বছর আগেই। বাস্তবে কাজির গরু কেতাবে থাকলেও গোয়ালে নেই।
তবে সরকারি কর্মকমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের আশ্বাস, এখন থেকে এক বছরের মধ্যেই বিসিএস শেষ করতে কাজ চলছে। এর মধ্যে তৈরি হয়েছে রোডম্যাপ। আর এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা চেয়েছেন তিনি।
সরকারের তরফ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
পিএসসির বর্তমান হালচাল
বর্তমানে পিএসসির অধীনে চলছে ৪৬-৫০তম বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া। এর মধ্যে ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে মৌখিকের প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৬ সালের শেষদিকে বা ২০২৭ সালের শুরুতে চূড়ান্ত সুপারিশ হতে পারে। এতেও সময় লাগবে সাড়ে তিন বছর। ৪৭তম বিসিএস বর্তমানে লিখিত পরীক্ষা পর্যায়ে রয়েছে। এই বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশ ২০২৭ সালের মধ্যে হলেও সময় লাগবে তিন বছরের বেশি। ৪৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর ফল এখনো প্রকাশের অপেক্ষায়।
রোডম্যাপ অনুযায়ী, এই বিসিএস শেষ হতে পারে ২০২৮ সালের মাঝামাঝি। অর্থাৎ, এটা করতেও মোট সময় দাঁড়াবে সাড়ে তিন থেকে চার বছর। ৪৯তম বিসিএসের এখনো প্রাথমিক পর্যায় বিজ্ঞপ্তি ও আবেদনপ্রক্রিয়া চলছে। এই বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশ পেতে ২০২৮-২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৫০তম বিসিএস, পিএসসির জন্য পরীক্ষা
পিএসসি ৫০তম বিসিএসকে ‘এক বছরে এক বিসিএস’ রোডম্যাপের মডেল হিসেবে সামনে আনতে চায়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ করা হয়। আর গত ৯ থেকে ২৩ এপ্রিল ১৫ দিনে লিখিত পরীক্ষা শেষ করেছে। আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ রয়েছে। এরপর সব ঠিক থাকলে ১০ আগস্ট থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু করে ২৫ নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশ শেষ করতে চায় পিএসসি।
এত দিনের অনভ্যস্ততার পর এক বছরের মধ্যে এই বিসিএসের কাজ শেষ করা পিএসসির জন্য পরীক্ষাই বটে।
কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, গতানুগতিক ধারা বদলে এখন প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত মডারেটররা সশরীরে কমিশনে উপস্থিত থেকে তৈরি করছেন প্রশ্নপত্র। এ ছাড়া কমিশনের নিজস্ব প্রেসে ছাপা হচ্ছে প্রশ্নপত্র। এতে পরীক্ষার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাশ্রয় হচ্ছে সময় ও অর্থ।
কর্মকর্তারা বলছেন, এতে মিলেছে সুফলও। এটি প্রয়োগ করায় সবশেষ ৪৬তম বিসিএসে ৩৩ কর্মদিবসে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষ করে প্রকাশ করা গেছে ফলাফল।
তিন-চার বছরের সময়কে মাত্র এক বছরে নামিয়ে আনতে কমিশন নানা তৎপরতা শুরু করেছে জানিয়ে পিএসসির সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন বললেন, ‘এর ফলে শুধু ২০২৫ সালেই চারটি বিসিএসের চূড়ান্ত সুপারিশ করা সম্ভব হয়েছে। মাত্র এক বছরে দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ করে ক্যাডার, নন-ক্যাডারে সাড়ে ১২ হাজার বেশি পদে নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে, যা কমিশনের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত।’
কমিশন আশা প্রকাশ করলেও বছরের পর বছর বিসিএস পরীক্ষার নানা ধাপের জন্য অপেক্ষায় থাকা পরীক্ষার্থীরা অবশ্য সে প্রত্যাশা করতেও পারছেন না। ফলে এক বছরে এক বিসিএস আদৌ বাস্তবে রূপ নেবে নাকি স্বপ্ন হয়েই রয়ে যাবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।



