বানে বানরে মানুষের জীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী হলে

ছবি কোলাজ আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিয়ে কম কথা হয়নি। সম্প্রতি ছাত্রী হলগুলোর সান্ধ্য আইনের প্রতিবাদ স্থান পাচ্ছে খবরের শিরোনামে, সম্পাদকীয় পাতায়। তবে কিছু সংকট যেন চিরস্থায়ী। এ নিয়ে নতুন কোনো উদ্যোগ নিতেও দেখা যায় না। এমনকি টেবিলেও হয় না দৃশ্যমান কোনো আলোচনা। সরকার আসে, সরকার যায়। এসব সংকট কেবল হয় ছোট থেকে বড়। হয়ে উঠে নিত্যদিনের স্বাভাবিক সঙ্গী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা অধীকাংশ শিক্ষার্থীর একমাত্র আশ্রয়স্থল আবাসিক হলগুলো। তাদের স্বপ্ন থাকে হলে থেকেই যেন শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। ক্যান্টিনের নামমাত্র মূল্যের ডালভাত অনেকেরই একমাত্র আহার। পুষ্টিগুণের কথা না হয় তোলা থাক। কিন্তু আড়ালে কিছু সংকট যা কেবল আবাসিক শিক্ষার্থীরাই টের পায়। বিশেষ করে নিউমার্কেট এলাকার দুটি ছাত্রী হল যেন দুর্ভোগের মহাসাগর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বানরের উৎপাত— এ যেন শহরের বুকে বনে থাকার লড়াই। বানে বানরে আর মানুষের এমন প্রতিকূল মিথষ্ক্রিয়া এ যুগেও ভাবা যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার পর একজন শিক্ষার্থীর সংগ্রাম শুরু হয় হলের সিট বরাদ্দ পাওয়া নিয়ে। ক্যান্টিনের সূলভ মূল্যে মোটা চাল আর পাতলা ডালে উদরপূর্তি মূখ্য থাকে না। ঢাকার বুকে সাধ্যের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়স্থলই প্রাধান্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা রয়েছে। মোট আবাসিক হল ২০টি। ছাত্রদের ১৪টি ও ছাত্রীদের ৫টি। আর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ হল। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য কয়েকটি হোস্টেলও আছে।
কিন্তু সবগুলো হলের অবস্থান ক্যাম্পাসের মধ্যে নয়। ক্যাম্পাসের বাইরে আছে ৩টি হল। ছাত্রীদের ৫টি হলের মধ্যে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল অবস্থিত নিউমার্কেটের ব্যস্ত এলাকায়। দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বরাদ্দ থাকে হলগুলোতে। প্রতিদিন তাদের ক্লাসে যেতে হয় নিউমার্কেট ও নীলক্ষেতের মতো ব্যস্ত এলাকা, তীব্র জনসমাগম ও যানজট পেরিয়ে। বৃষ্টির দিনে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায় দুটি হল। এ সময়টায় থাকে না বিদ্যুৎ। ব্যবসাবহুল এলাকা হওয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও সবসময় থাকে শঙ্কা।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। গত ১২ জুলাই ভারী বর্ষণে নিউমার্কেট এলাকা তলিয়ে যায়। বিদ্যুৎজনিত হতাহতের ঘটনা এড়াতে হল দুটির সংযোগ বন্ধ রাখা হয় ১২ ঘণ্টার বেশি। ছিল না কোনো পূর্ব নোটিস। একসময় পানি শূন্য অবস্থায় অন্ধকার জলাবদ্ধ ও একযুগ পুরনো সময়ে ফিরে যায় ১৭০০’র বেশি শিক্ষার্থী। ডাকসুর উদ্যাগে বন্যার্তদের মতো বিতরণ করা হয় ত্রাণ।
নিউমার্কেটের হলগুলো এভাবেই প্রশাসনের দৃষ্টির আড়ালে থাকে। বর্ষা আর যাতায়াতের দুর্ভোগের সঙ্গে আজকাল বানরের উপদ্রব যুক্ত হয়েছে। বর্ষায় হলগুলো রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট সাজলেও ইদানিং শিক্ষার্থীরা দিনাতিপাত করছে সাফারি পার্কে। বঙ্গমাতা হলের শিক্ষার্থীদের দিন শুরু হয় বানরের আক্রমণে চিৎকার দিয়ে। কেউ খাবার হাতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। হঠাৎ ছিনতাইকারীর বেশে হাজির বানরগুলো। মুহূর্তেই উধাও খাবার নিয়ে। মাথার ওপরে সিলিংয়ে নেই পাখার ব্যবস্থা। দুহাত সমান বিছানায় ঘুমাতে হয় দুজনকে। তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে যেই না দরজা খুলে ঘুমাতে গেল তাতেই বিপত্তি। সকালে ঘুম ভেঙে দেখতে হয় মাথার ওপর লেজ ঝুলিয়ে বানর বসে।
শুধু খাবার নিয়েই তো প্রাণীটি থেমে নেই। রুমের ভেতর চালা তাণ্ডব। ডিম, পাউরুটি, নুডুলস, চানাচুর সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে নৈমিত্তিক কাজ সারে এরা। বানর কী না করে? বানরের হিংস্র আঁচড় বা কামড়ে হতে পারে র্যাবিস। এই নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটায় হাজারো শিক্ষার্থী। তাতেও নেই কোনো পদক্ষেপ। প্রশাসন তো না, বনবিভাগও নেই।
ছাত্র-শিক্ষকদের মেধা আর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাতি এনে দিলেও শিক্ষার্থীদের জীবনমান আর অবশিষ্ট নেই। এমন পরিবেশে থেকে একজন শিক্ষার্থী সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে এটাই যেন বিস্ময়!
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়







