বিদ্যুৎ থেকেও কেন বিদ্যুৎ নেই

প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট কি সত্যিই ‘বিদ্যুৎ সংকট?’ নাকি এর মূলে লুকিয়ে আছে জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং দূর্বল বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা? সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা এই প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে এনেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সংকট ও অব্যবস্থাপনায় যখন উৎপাদন কমে যায়, তখন বোঝা যায় সমস্যা কেবল কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তার হিসাব নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি, অর্থায়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও এতে জড়িত।
প্রথমেই যে বৈপরীত্যটি চোখে পড়ে, তা হলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন আর আগের মতো সীমিত নয়। ২০২৬ সালের মার্চে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট, যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। অথচ একই সময়ে দৈনিক গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল। অর্থাৎ কাগজে থাকা সক্ষমতা আর বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ব্যবধান হয়েছে আরও প্রকট। গত ১০ আগস্ট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছাড়িয়ে যায় ৩ হাজার মেগাওয়াট।
এই ব্যবধানের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাস। কারণ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো গ্যাসনির্ভর। কিন্তু দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমার পাশাপাশি এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। একটি এলএনজি টার্মিনাল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জুলাইয়ের শেষ দিকে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ১৫০ এমএমসিএফের নিচে নেমে যায়। আর স্বাভাবিক সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬৫০ এমএমসিএফের কাছাকাছি। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি। একই সময়ে কয়লা সরবরাহের সমস্যাও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে আরও চাপে ফেলেছে।
লোডশেডিংয়ের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। বিদ্যুৎ না থাকলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, কারখানাকে ব্যয়বহুল ডিজেল বা অন্যান্য বিকল্প জ্বালানিতে যেতে হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম, রপ্তানি সক্ষমতা ও বিনিয়োগের পরিবেশে পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু ভোক্তার দুর্ভোগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষতি বোঝা যাবে না। এটি উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি বড় আর্থিক সংকট। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে বেশি জ্বালানি কিনতে হবে। কিন্তু আমদানিনির্ভর জ্বালানি, বিশেষ করে এলএনজি, বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি ভর্তুকির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আবার আর্থিক চাপ কমাতে জ্বালানি কেনা সীমিত করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে এবং লোডশেডিং বাড়ে। অর্থাৎ একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আর্থিক ব্যয়, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি দুইয়ের মাঝখানে সরকারকে কঠিন ভারসাম্য করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া ও এলএনজি ভর্তুকির চাপ এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এই সংকটের প্রভাব শিক্ষাঙ্গনেও পৌঁছেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশে পাঠদান ব্যাহত হয়। প্রজেক্টর, কম্পিউটার, ইন্টারনেটনির্ভর ক্লাস ও গবেষণার কাজও বাধাগ্রস্ত হয়। আবাসিক হলগুলোতে রাতের লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে বিদ্যুৎ সংকট শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটি অদৃশ্য ব্যয় তৈরি করছে।
তাই সমাধান শুধু আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নয়। প্রথমত, বাংলাদেশের জ্বালানি উৎসকে বহুমুখী করতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে রুফটপ সোলার ও অন্যান্য ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার ব্যবস্থা ‘পিক আওয়ারের’ চাপ কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
পরিশেষে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে পাওয়ার প্ল্যান্ট থাকা মানেই বিদ্যুৎ থাকা নয়। প্রয়োজনীয় জ্বালানি, তা কেনার আর্থিক সক্ষমতা এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার অবকাঠামো এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলেই নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব। লোডশেডিং তাই কেবল অন্ধকারের সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সুশাসনের পরীক্ষা। এখন সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা গোনার বদলে একটি আর্থিকভাবে টেকসই, জ্বালানি-নিরাপদ ও বহুমুখী বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তোলার।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






