১ লাখ কেয়ারগিভার নেবে জাপান
৩ লাখ টাকা বেতনের হাতছানি
- ২০২৬ সালে জাপানে কেয়ারগিভারের চাহিদা ২৪ লাখ -এমএইচএলডব্লিউ
- নার্স ও কেয়ারগিভার পাঠানোর বিষয়ে আগে থেকেই কাজ চলছে -সভাপতি, বিএনএ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাপানের বার্ধক্যপীড়িত শ্রমবাজারে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১ লাখ কেয়ারগিভার বা পরিচর্যাকারীর এক সুযোগ। যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনতে পারে নতুন রেমিট্যান্স-বিপ্লব। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রবীণ হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা খাতে সৃষ্টি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ শূন্যতা। যেখানে প্রারম্ভিক বেতনই মাসে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ লাখ টাকার ওপরে। তা ছাড়া, পরে জাপানের জাতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে বা দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার ভিসা পেলে এই আয় বেড়ে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কিন্তু এই আকাশচুম্বী সম্ভাবনার মুখেই দাঁড়িয়ে আছে এক বড় দেওয়াল। সেটি হচ্ছে ভাষাগত অদক্ষতা ও কাঠামোগত প্রশিক্ষণের তীব্র ঘাটতি। ফিলিপাইন কিংবা ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো যখন আগাম প্রস্তুতি নিয়ে বাজারের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। তখন আমাদের প্রাচুর্যে ভরা তরুণ ও পেশাদার নার্স শক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের ভাষা ও কারিগরি দক্ষতায় শাণিত করে এই বিশাল বাজার ধরার লড়াইয়ে নামার এখনই মোক্ষম সময়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে জাপান ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন আশার আলো সৃষ্টি হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বাণিজ্য প্রসারের পাশাপাশি এই সফরের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উঠে এসেছে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি, বিশেষ করে কেয়ারগিভার বা পরিচর্যাকারী ও নার্সিং সেবা খাত। জাপানের তীব্র জনমিতিক সংকট এবং বাংলাদেশের তরুণ মানবসম্পদের মেলবন্ধন দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন রেমিট্যান্স বিপ্লব ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
জানতে চাইলে, বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) সভাপতি শরিফুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানান, জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি নার্স ও কেয়ারগিভার পাঠানোর বিষয়ে আগে থেকেই কাজ চলছে। তথ্য অনুযায়ী, জাপান আগামীতে প্রায় ১ লাখ কেয়ারগিভার নিয়োগ দেবে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ হাজার ডিপ্লোমা ও গ্র্যাজুয়েট নার্স শিক্ষাজীবন শেষ করে বের হচ্ছেন। এই বিশাল বাহিনীকে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাপানে পাঠানো গেলে দেশ বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
অদক্ষ বা স্বল্প-প্রশিক্ষিত কর্মীদের তুলনায় সার্টিফিকেটধারী নার্সদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে শরিফুল ইসলাম বললেন, ‘এসএসসি পাস করার পর মাত্র তিন মাসের একটি শর্ট কোর্স করিয়ে কাউকে কেয়ারগিভার হিসেবে জাপানে পাঠানোর চেয়ে, আমাদের পেশাদার নার্সদের পাঠালে তারা অনেক বেশি কার্যকর ও সফল হবেন। একজন ডিপ্লোমা বা গ্র্যাজুয়েট নার্সকে যদি জাপানি ভাষা শেখানো হয়, তারা সহজেই সে দেশের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে পারবেন।’
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মহাসচিব রবিউল আলমের মতে, জাপানি বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অবিলম্বে ভাষা ও কারিগরি শিক্ষার পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ নার্স ও পরিচর্যাকারী পাঠাতে পারলে আগামী দিনে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
বিশ্বের অন্যতম প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দেশ জাপানে বর্তমানে জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। ফলে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণদের যত্ন ও হাসপাতালে সহায়ক কর্মীর মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। জাপানি কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, দেশটির সেবা খাতে প্রতি বছর কয়েক লাখ বিদেশি দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত কর্মসংস্থানবিষয়ক সহায়তা স্মারক ও বিশেষায়িত দক্ষ কর্মী ক্যাটাগরির অধীনে বাংলাদেশ থেকে নার্স ও কেয়ারগিভার নিয়োগকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জাপানের মিনিস্ট্রি অব হেলথ, লেবার অ্যান্ড ওয়েলফেয়ারের (এমএইচএলডব্লিউ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জাপানে কেয়ারগিভার কর্মীর চাহিদা ছিল ২১ দশমিক ৫ লাখ, ২০২৬ সালে এই চাহিদা এসে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখে এবং ২০৪০ সালে তা দাঁড়াবে ২৭ দশমিক ২ লাখে।
এ ছাড়া জাপানের অন্যান্য শিল্প খাতে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে রিক্রুট ওয়ার্কস ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, জাপানের শ্রমবাজারে সম্ভাব্য শ্রমিক ঘাটতি ২০৩০ সালে প্রায় ৩৪ লাখ এবং ২০৪০ সালে প্রায় ১ দশমিক ১ কোটি হতে পারে।
অন্যদিকে জাপানের সরকারি শ্রমনীতি-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাপান ইনস্টিটিউট ফর লেবার পলিসি অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (জেআইএলপিটি) ২০৪০ সালের কর্মসংস্থান পূর্বাভাসে দেখা যায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর পদক্ষেপ না থাকলে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ২০২২ সালের ৬ দশমিক ৭২৪ কোটি থেকে ২০৪০ সালে প্রায় ৫ দশমিক ৭৬৮ কোটিতে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ৯৫ দশমিক ৬ লাখ কর্মরত মানুষের হ্রাস।
বাংলাদেশে একজন নার্স বা পরিচর্যাকারী শুরুতে যে উপার্জন করেন, জাপানে তার সুবিধা কয়েক গুণ বেশি। সেখানে একজন শিক্ষানবিশ কেয়ারগিভারের প্রারম্ভিক মূল বেতন বাংলা টাকায় প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নাইট শিফটে ডিউটি, আবাসন ভাতা ও অতিরিক্ত সময়ের কাজ যুক্ত হলে মাসিক আয় সহজে ২ লাখ টাকা অতিক্রম করে।
বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ভাষাগত যোগ্যতা ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত সাড়া দিতে পারছে না। জাপানে কেয়ারগিভার হিসেবে যেতে হলে কাজের দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষার নির্দিষ্ট মান অর্জন করতে হয়, যার জন্য দেশে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সুনির্দিষ্ট ভাষা চর্চার ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নিজেদের কর্মীদের আগাম প্রস্তুত করে জাপানের বাজারে বেশ এগিয়ে আছে।
মেহেদী হাসান রনি একজন জাপানপ্রবাসী। জাপানি ভাষা শিখে বছর তিনেক আগে তিনি জাপানে পাড়ি জমান। বর্তমানে তিনি সে দেশের একটি প্রকাশনী সংস্থায় (পাবলিশিং কোম্পানি) মেশিন অপারেটর হিসেবে কর্মরত আছেন।
জাপানের কর্মপরিবেশ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘এখানে কাজের পরিবেশ চমৎকার। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিশ্চিত করা হয় জীবন বীমাসহ সব ধরনের ঝুঁকি বীমা। এমনকি অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিরও সুব্যবস্থা রয়েছে। জাপানে জোর করে অতিরিক্ত কাজ করানো কিংবা কাজ করিয়ে বেতন না দেওয়ার মতো কোনো অমানবিক আচরণ কেউ ভাবতেও পারেন না।’
জাপানে ক্যারিয়ার গড়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে মেহেদী আরও জানালেন, প্রয়োজনীয় জাপানি ভাষা শিখে এ দেশে আসতে পারলে নিশ্চিত চাকরি পাওয়া সম্ভব।



