সংকটে বস্ত্রশিল্পের সক্ষমতা অর্ধেকে নেমেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকায় প্রতিযোগী কয়েকটি দেশের তুলনায় তৈরি হয়েছে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থান। কিন্তু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব নয়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের জ্বালানি ও অর্থায়ন সংকট দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা এবং এর আশপাশ এলাকাগুলো— নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ এবং গাজীপুরে গত এক সপ্তাহ গ্যাস পাচ্ছে না কারখানাগুলো। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বস্ত্র খাত। কারণ, এখানে সবচেয়ে বেশি গ্যাস লাগে। ফলে এ খাতের বেশিরভাগ কারখানাই তাদের সক্ষমতার ৫০ শতাংশের কম ব্যবহার করতে পারছে বলে অভিযোগ করেন বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) আগামীর সময়কে বলেছেন, অনেক কারখানা গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু এলাকায় পাওয়া গেলেও তা কারখানা চালানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ খাত রুগ্ণ হয়ে যাচ্ছে। দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন কারখানার মালিকরা। এ দায় সরকারকে নিতে হবে। সরকার শিল্পমালিকদের সুরক্ষা দিতে পারছে না। আর দেশীয় শিল্পমালিকরা ভালো না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ আশা করা যায় না।
রপ্তানি খাতের বিভিন্ন সংকট সমাধানে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী পোশাক ও বস্ত্র খাতের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এখনো অফিসিয়ালি কোনো আদেশ জারি করা হয়নি। এ ছাড়া ওই বৈঠকে রপ্তানি খাতের জন্য স্বল্প খরচে ঋণ দেওয়ার একটি ‘বিশেষ স্কিম’ চালুর কথা রয়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে এবং কত দ্রুত নীতি সহয়তা দেয়, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য নীতি সহায়তা প্রদান করা।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ— দুই ধরনের চাপেই বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত কঠিন সময় পার করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।
শোভন ইসলাম বললেন, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘ লিড টাইম, উচ্চ সুদহার এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, আবার কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। রপ্তানিকারকদের জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল ও প্রি-শিপমেন্ট তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তারল্য সংকটের কারণে সময়মতো অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। তার মতে, রপ্তানি খাতে গতি ফিরিয়ে আনতে হলে সুদের হার কমানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গত ২৪ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন শুল্ক কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কৌশলের অংশ। সেকশন ৩০১-এর আওতায় বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ শুল্ক স্তরে রাখা হয়েছে; যেখানে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশের ক্ষেত্রে হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশ প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছে।
মহিউদ্দিন রুবেল জানালেন, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিতে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতির কারণেই বাংলাদেশ নিম্ন শুল্ক স্তরে রয়েছে। ভবিষ্যতে ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) চালু হলে বাংলাদেশের কিছু টেক্সটাইল ও পোশাক শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে, তবে এটি এখনো কার্যকর হয়নি।
রুবেল বললেন, শুধু শুল্ক সুবিধা যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এ সুবিধা কাজে লাগাতে উৎপাদনশীলতা, পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজন বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার ও অর্থায়ন সমস্যার সমাধান জরুরি।




