হাজার কোটি টাকার ব্যবসা রপ্তানি তলানিতে
- হিমাগারের দাবি চাষিদের
- গত বছর জিআই পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয় বেদানা লিচু

কালিতলা নিউ মার্কেটে লিচু কেনা-বেচায় ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা। ছবি : আগামীর সময়
দিনাজপুরের লিচু বেচাকেনা এখন তুঙ্গে। বাগান থেকে বাজারে ব্যস্ত সময় কাটছে বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের। প্রতিদিন হাজার হাজার লিচু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। প্রতি বছর দেশীয় বাজারে ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার লিচুর কেনাবেচা হলেও রপ্তানি এখনো তলানিতে। কৃষকদের আক্ষেপ, উন্নত বিশ্বের বাজারে এই সুস্বাদু ফলের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সংরক্ষণের অভাব এবং উপযুক্ত কাঠামোর অভাবে তারা পড়ছেন পিছিয়ে।
জেলার কৃষি রপ্তানির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দিনাজপুরে ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের বিপরীতে ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়েছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৮০ মেট্রিক টন লিচু। ২০২৫ সালেও ৩৬ হাজার ৬২৮ মেট্রিক টন উৎপাদনের বিপরীতে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স ও সৌদি আরবে মাত্র ৩ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন লিচু বিদেশে যায়। তাই লিচু রপ্তানির হার বাড়াতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা চেয়েছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, রপ্তানির জন্য বিশেষ আন্তর্জাতিক মান ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, যা অনেক চাষি করতে চান না বা তাদের সেই সক্ষমতা নেই। এ ছাড়া লিচু দ্রুত পচনশীল ফল হওয়ায় সংরক্ষণের জন্য জেলায় কোনো হিমাগার না থাকাও রপ্তানি বাধার অন্যতম বড় কারণ।
অথচ কয়েক দশক ধরে জেলার ১৩টি উপজেলায়ই অত্যন্ত সফলভাবে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ হচ্ছে। গত বছরের ৩০ এপ্রিল ‘বেদানা’ জাতের লিচু ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বহির্বিশ্বে এর কদর আরও বেড়েছে। জেলায় বর্তমানে মোট ১০ হাজার ৬৬টি লিচু বাগানে প্রায় ৫ হাজার ৪৮৪ হেক্টর জমি জুড়ে আবাদ চলছে। বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না-থ্রি, চায়না-টু, বেদানা, কাঁঠালি এবং মোজাফফরি জাতের লিচু মিলিয়ে চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।
দেশীয় বাজারে এই লিচুর বিপুল চাহিদা রয়েছে। উৎপাদিত লিচুর ২০ শতাংশ জেলার চাহিদা মেটায় এবং বাকি ৮০ শতাংশ যায় দেশের অন্যত্র। শহরের লিচু কেনাবেচার বড় বাজার কালিতলা নিউ মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, জাতভেদে প্রতি ১০০টি লিচু ৩০০ থেকে শুরু করে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়ে চাষিরা মুকুল আসতেই বাগান বিক্রি করে দেওয়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষকরাও প্রকৃত লাভ থেকে হন বঞ্চিত।
তলানিতে থাকা এই রপ্তানি খাতকে টেনে তুলতে অবশ্য চলতি মৌসুমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েক জাতের লিচু ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স ও সৌদি আরবে রপ্তানির বড় পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য সদর ও বিরল উপজেলার বাগানগুলোয় কৃষি বিভাগের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিশেষ পরিচর্যা চলছে। স্কয়ার ফুড ও বেভারেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান চার হাজার মেট্রিক টন লিচু রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
কৃষকদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে দ্রুত একটি হিমাগার স্থাপন করা হলে সংরক্ষণ সুবিধা বাড়বে, যা লিচুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি রপ্তানির এই করুণ চিত্র পাল্টে দিতে রাখবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা।




