শিল্প নয়, বিকল্প খাতে বিনিয়োগ খুঁজতে হবে

মো. ফজলুল হক
আগামী দু-তিন বছর প্রথাগত শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ না খুঁজে বিকল্প খাতে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক। আগামীর সময়ের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী
প্রশ্ন: ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যে জিডিপিতে বিনিয়োগের অবদান ৪০ শতাংশ হতে হবে, যা এখন ২৯ শতাংশ। এই গ্যাপ এত অল্প সময়ে পূরণ করা কতটা বাস্তবসম্মত?
ফজলুল হক: এটি সহজ অঙ্কের হিসাব যে, আগামী সাত-আট বছর জিডিপিতে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাষী হওয়া ভালো, কারণ এটি কাজের প্রতি প্রেশার তৈরি করে। আজকের বাস্তবতায় এটি কঠিন মনে হলেও অসম্ভব নয়। জ্বালানি ও ব্যাংক খাতের অগোছালো পরিস্থিতি দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারলে কাঙ্ক্ষিত এ লক্ষ্যে পৌঁছানো অবশ্যই সম্ভব বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন: জ্বালানি সংকটের এ সময়ে আগামী দুই বছরে বিনিয়োগের গতি বাড়াতে কী ধরনের পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ফজলুল হক: বিনিয়োগ বললেই আমরা শুধু শিল্পকারখানার কথা বুঝি। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে নতুন কারখানা গড়া দুঃসাহসিক ব্যাপার। তাই আগামী দু-তিন বছর প্রথাগত শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ না খুঁজে বিকল্প খাতে মনোযোগ দেওয়া উচিত। যেসব খাতে জ্বালানির চাহিদা কম, যেমন— সৌরবিদ্যুৎ, আইটি, এআই, সেবা খাত বা বে-টার্মিনালে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই আমাদের কয়লা উত্তোলনের বিকল্প ব্যবস্থা করা দরকার।
প্রশ্ন: সরকার নানা ছাড় দিচ্ছে, সম্মেলন করছে, অন্যদিকে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কি আসবে?
ফজলুল হক: শুধু বিনিয়োগ সম্মেলন করলেই বিনিয়োগ আসবে না। বর্তমানে যেসব শিল্পকারখানা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে, সবার আগে সেগুলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারলে নতুন বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই আস্থা পাবেন। বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে আমরা হয়তো নতুন কন্টাক্ট পেতে পারি; কিন্তু এরপর ওয়ান-টু-ওয়ান ফলোআপ রাখাটা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
প্রশ্ন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বাড়ানো হয়েছে, ফলে ব্যবসার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সুদে কীভাবে বিনিয়োগ করবেন? এটি কীভাবে দেখছেন?
ফজলুল হক: উচ্চ সুদ ব্যবসার খরচ বহুগুণে বাড়ায়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। আমাদের দেশের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থায় অনেক দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। গ্রাম থেকে পণ্য উৎপাদন হয়ে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে পারলে মূল্যস্ফীতি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
প্রশ্ন: ব্যাংক খাতে এখন পাহাড়সমান খেলাপি ঋণ। ব্যাংকের মূলধন আটকে থাকলে নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ কীভাবে আসবে?
ফজলুল হক: খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে, তা ফেরত আনা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে দেশে থাকা খেলাপিদের জন্য সরকার যে এক্সিট সুবিধা বা এককালীন সুদ মওকুফের রুট দিয়েছে, তা নিয়ে ব্যাংকারদের আপত্তি থাকলেও একটি সমঝোতায় আসা দরকার। না হলে ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটবে না এবং নতুন ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে না।
প্রশ্ন: বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই বাড়ানোর জন্য আগামীতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
ফজলুল হক: বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শুধু জমি বা বিদ্যুৎ দিলেই হবে না, তাদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা দিলে বিনিয়োগকারীরা উল্টো আতঙ্কিত হন; তাদের নিরাপদ ‘বোধ’ করানোটা বেশি জরুরি। মুনাফা নিজ দেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘসূত্রতাও দূর করতে হবে। বর্তমান সরকারের যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে, তা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
প্রশ্ন: বাজেটে বিনিয়োগের জন্য নানা করছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এনবিআরের নীতি সংস্কারের ঘাটতি থাকলে এটি কতটা কার্যকর হবে?
ফজলুল হক: বাজেটের করছাড় সরকারের ইতিবাচক রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড় প্রমাণ। কিন্তু যারা এটি বাস্তবায়ন করবে, সেই আমলাতন্ত্র বা এনবিআরের আন্তরিকতায় ঘাটতি রয়েছে। আমলাদের প্রো-বিজনেস বা ব্যবসাবান্ধব করতে হলে রাজনীতিবিদদের তাদের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন: সম্প্রতি আমেরিকা ও ভারতের বিনিয়োগকারী দল দেশে এসেছে। ভারতীয় দলের সঙ্গে মিটিংয়ে আপনাদের কী আলোচনা হলো?
ফজলুল হক: আমেরিকার দলটির আসা একটি খুব ভালো সূচনা। আর ভারতীয় প্রতিনিধিদল দুটি চমৎকার টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমটি, অবকাঠামো উন্নয়নে দেশি-বিদেশি প্রাইভেট ফান্ড আনা। দ্বিতীয়টি, আধুনিক ‘সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রি’ যেমন এআই বা সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা।
প্রশ্ন: পরিশেষে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল বার্তা কী?
ফজলুল হক: আমি মোটেও হতাশাবাদী নই। চলমান সংকটগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে আলাদাভাবে সমাধান করতে হবে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এ সাময়িক সংকটের কারণে অর্থনীতির অন্য সম্ভাবনাময় খাতগুলো যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।







