একমি পেস্টিসাইডসের প্রি-আইপিওতে নিরীক্ষকের দায় নিরূপণে তদন্ত

সংগৃহীত ছবি
শেয়ারবাজারে ওষুধ ও রসায়ন খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তবে আসার আগের (প্রি-আইপও) নিরীক্ষা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে কোম্পানিটির প্রি-আইপিওকালীন সময়ের নিরীক্ষকের দায় নিরূপণ এবং আর্থিক প্রতিবেদনের অন্যান্য অসঙ্গতি যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এ লক্ষ্যে বেশকিছু শর্তসাপেক্ষে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটিকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শেয়ারবাজারে নিরীক্ষা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
সম্প্রতি বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করা হয়েছে।
তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য গঠন করা হয়েছে বিএসইসির তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি দল। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএসইসির উপ-পরিচালক আসিফ ইকবাল। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী পরিচালক তন্ময় কুমার ঘোষ এবং বিনয় দাস।
বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, একমি পেস্টিসাইডসের প্রি-আইপিওকালীন আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকৃত তথ্যের সঠিক প্রতিফলন ছিল না। সে সময় কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও যাচাইয়ের দায়িত্বে ছিল নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং। এ চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট (সিএ) ফার্ম তৎকালীন কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে বিদ্যমান অসঙ্গতিগুলো চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে সেগুলো এড়িয়ে গেছেন। একটি কোম্পানির তালিকাভুক্তির আগে তার আর্থিক স্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে নিরীক্ষকের দায় নিরূপণ করতেই এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটি নিরীক্ষকের গাফিলতি ও দায় নিরূপণ করবেন।
বিএসইসির তদন্তের আদেশ
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকৃত ও নিরপেক্ষ চিত্র (ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার ভিউ) না থাকা সত্ত্বেও, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তাই কোম্পানিটির প্রি-আইপিওকালীন সময়ে নিরীক্ষকের দায় নিরূপণের লক্ষ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এই পরিস্থিতিতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর ধারা ২১ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ এর ধারা ১৭ক অনুযায়ী কমিশন একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গঠিত কমিটির সদস্যরা এই আদেশ জারির তারিখ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করবেন।
যেসব বিষয় অনুসন্ধান করবে তদন্ত কমিটি
প্রি-আইপিও সময়কালে একমি পেস্টিসাইডসের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি, তথ্য গোপন বা পেশাগত অবহেলা হয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখবে গঠিত অনুসন্ধান ও তদন্ত। এছাড়া বিশেষ করে নিরীক্ষক তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন কি-না এবং বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত হওয়ার মতো কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে কি-না সে বিষয়টা গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করবে গঠিত কমিটি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইপিও’র আগে আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ফেলে। যদি কোনো নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান জেনে-বুঝে ভুল তথ্য সংবলিত প্রতিবেদনে প্রত্যয়ন দেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রি-আইপিও পর্যায়ে নিরীক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে তালিকাভুক্তির আগে আর্থিক প্রতিবেদনের মান আরও উন্নত হবে। এই ধরনের তদন্ত কার্যক্রম বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারেও হবে সহায়ক। অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং নিয়মিত নজরদারি শেয়ারবাজারকে আরও স্থিতিশীল ও কার্যকর করবে।
কমিশন বলছে, তদন্তে কোন অনিয়ম বা দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ০.০১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে একমি পেস্টিসাইডসের পরিচালনা পর্ষদ। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১.১৪ টাকা। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ০.৭৬ টাকা। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১৬.৪১ টাকা।
শেয়ার ধারণ পরিস্থিতি
একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০২১ সালে। ‘বি’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১৩৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ১৩ কোটি ৫০ লাখ। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির উদ্যোক্তাদের হাতে ৩১.৮০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২৭.০৩ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪১.১৭ শতাংশ শেয়ার আছে। রবিবার (১৯ এপ্রিল) কোম্পানিটির শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২৫.৫০ টাকায়।

